সংসদে বিরোধীদের বিক্ষোভ: ১৯% উৎপাদনশীলতায় শেষ বর্ষাকালীন অধিবেশন
২০২৬ সালের বর্ষাকালীন অধিবেশন শেষ হল তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা ও ধারাবাহিক বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে। লোকসভার উৎপাদনশীলতা মাত্র ১৯ শতাংশ, রাজ্যসভার ৩৯ শতাংশ।
নয়াদিল্লি : প্রবল রাজনৈতিক উত্তেজনা, বিরোধীদের ধারাবাহিক বিক্ষোভ এবং সরকার-বিরোধী মতপার্থক্যের মধ্য দিয়ে শেষ হল ২০২৬ সালের সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন। বৃহস্পতিবার লোকসভা ও রাজ্যসভা দু’টি কক্ষই sine die মুলতুবি করা হয়েছে। অধিবেশনের শেষ দিনেও বিরোধীদের স্লোগান ও বিক্ষোভের কারণে স্বাভাবিক কাজকর্ম বারবার ব্যাহত হয়।
২০ জুলাই শুরু হওয়া এই অধিবেশনের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য ছিল বিরোধী দলগুলির ধারাবাহিক প্রতিবাদ। প্রথম দিকে NEET-সংক্রান্ত অনিয়ম এবং অযোধ্যায় রামমন্দিরের অনুদান নিয়ে অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিরোধীরা সরব হয়। পরে ছাত্র আন্দোলনের সময় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বক্তব্যের দাবিতে বিক্ষোভ আরও তীব্র হয়।
অধিবেশনের শেষ পর্যায়ে সরকার বিরোধীদের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ছাত্র আন্দোলন নিয়ে সংসদে আলোচনার প্রস্তাব দেন। কিন্তু বিরোধীরা সেই প্রস্তাব গ্রহণ না করে নিজেদের দাবিতে অনড় থাকে। কংগ্রেসের বক্তব্য ছিল, ছাত্রদের বিরুদ্ধে পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে সরাসরি সরকারের কাছ থেকে জবাব চায় তারা। অন্যদিকে সরকার অভিযোগ করে, বিরোধীরা আলোচনায় অংশ না নিয়ে সংসদের কার্যক্রম ব্যাহত করেছে।
সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু অধিবেশন শেষে লোকসভার উৎপাদনশীলতা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁর দেওয়া হিসাবে, এই অধিবেশনে লোকসভার উৎপাদনশীলতা মাত্র ১৯ শতাংশ, আর রাজ্যসভার ৩৯ শতাংশ। রিজিজুর দাবি, সরকার একাধিক বিষয়ে আলোচনার সুযোগ দিতে চাইলেও বিরোধীরা বারবার অধিবেশন অচল করেছে।
তবে পুরো চিত্রটি শুধু বিরোধীদের বিক্ষোভ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বিরোধী দলগুলির পাল্টা অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই সরকার আইন পাস করার চেষ্টা করেছে। তাদের বক্তব্য, সংসদ শুধু বিল পাস করার জায়গা নয়, সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্ত নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা এবং জবাবদিহির প্রধান মঞ্চ। এই রাজনৈতিক মতপার্থক্যই শেষ পর্যন্ত অধিবেশনের কার্যক্রমকে প্রভাবিত করেছে।
উৎপাদনশীলতা কম হলেও আইন প্রণয়নের দিক থেকে অধিবেশন পুরোপুরি নিষ্ফলা ছিল না। সংসদে ১২টি বিল পাস হয়েছে বলে সরকারি হিসাবে জানানো হয়েছে। তবে বিতর্কের সুযোগ কতটা হয়েছে, তা নিয়েই মূল প্রশ্ন উঠেছে। রিজিজুর বক্তব্য অনুযায়ী, লোকসভায় মাত্র একটি বিল, Public Examinations (Prevention of Unfair Means) Bill, পূর্ণাঙ্গ আলোচনার সুযোগ পেয়েছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল FCRA সংশোধনী বিলকে Joint Parliamentary Committee বা JPC-তে পাঠানো। বিরোধীদের প্রবল আপত্তির মধ্যে লোকসভা বিলটি JPC-তে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে বিলটি তাৎক্ষণিকভাবে চূড়ান্ত আইন হয়ে ওঠেনি এবং সংসদীয় পর্যালোচনার আরও একটি পর্যায় তৈরি হয়েছে।
রাজ্যসভাতেও পরিস্থিতি খুব একটা আলাদা ছিল না। রাজ্যসভার চেয়ারম্যান সি পি রাধাকৃষ্ণন অধিবেশনে বারবার বিঘ্ন ঘটায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর দেওয়া হিসাবে রাজ্যসভার উৎপাদনশীলতা নেমে এসেছে ৩৯ শতাংশে। তিনি সাংসদদের সংসদীয় শিষ্টাচার বজায় রেখে গঠনমূলক আলোচনায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।
তবে ১৯ শতাংশ উৎপাদনশীলতা মানেই সংসদের ইতিহাসে সর্বনিম্ন উৎপাদনশীল অধিবেশন, এমনটা বলা ঠিক হবে না। Indian Express-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এর আগেও একাধিক অধিবেশনে উৎপাদনশীলতা আরও কম ছিল। ফলে এবারের অধিবেশন অত্যন্ত অকার্যকর হলেও এটিকে সরাসরি সর্বকালের রেকর্ড-নিম্ন বলা যাবে না।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের বর্ষাকালীন অধিবেশন সংসদীয় গণতন্ত্রের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে গেল। সরকারের আইন প্রণয়নের অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনই বিরোধীদের প্রশ্ন তোলা ও জবাবদিহি দাবি করার অধিকারও সংসদীয় গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু সেই বিতর্ক যদি লাগাতার বিক্ষোভে পরিণত হয়, তাহলে আইন নিয়ে গভীর আলোচনা বাধাগ্রস্ত হয় এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় সংসদীয় প্রক্রিয়াই।
এই অধিবেশনের ১৯ শতাংশ লোকসভা উৎপাদনশীলতা তাই শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। এটি সরকার ও বিরোধী দুই পক্ষের কাছেই একটি সতর্কবার্তা। আগামী অধিবেশনে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও আলোচনার সুযোগ এবং সংসদের কার্যকারিতা কীভাবে বাড়ানো যায়, সেটিই এখন বড় পরীক্ষা।

