ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে এমন কিছু টুর্নামেন্ট রয়েছে, যেগুলি শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়, বরং আবেগ, ঐতিহ্য এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা স্মৃতির অংশ। সেই তালিকার একেবারে শীর্ষে রয়েছে ইন্ডিয়ান অয়েল ডুরান্ড কাপ। বিশ্বের তৃতীয় প্রাচীনতম এবং এশিয়ার সবচেয়ে পুরনো ফুটবল প্রতিযোগিতার ১৩৫তম সংস্করণকে ঘিরে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে উত্তেজনা। আয়োজক কমিটি এবারের টুর্নামেন্টের পূর্ণাঙ্গ সূচি, অংশগ্রহণকারী দল এবং ভেন্যুর তালিকা প্রকাশ করেছে। আর সেই ঘোষণার পর থেকেই আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী—মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গল।
বছরের পর বছর ধরে ডুরান্ড কাপ মানেই কলকাতার ফুটবলপ্রেমীদের কাছে সবুজ-মেরুন বনাম লাল-হলুদের লড়াই। শুধু শিরোপা নয়, সম্মান, ইতিহাস এবং সমর্থকদের গর্বও জড়িয়ে থাকে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে। ফলে নতুন মরসুম শুরুর আগেই প্রশ্ন উঠছে—ডুরান্ড কাপের ইতিহাসে কার সাফল্য বেশি?
এবারের ডুরান্ড কাপ শুরু হবে ২৫ জুলাই। প্রায় এক মাস ধরে চলা এই প্রতিযোগিতার পর্দা নামবে ২৩ অগাস্ট, যখন কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে অনুষ্ঠিত হবে ফাইনাল ম্যাচ। আয়োজকদের আশা, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি বিদেশি অংশগ্রহণকারী দলগুলিও এবারের প্রতিযোগিতাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে।
পাঁচ শহরে ছড়িয়ে পড়বে ফুটবলের উৎসব
এবারের ডুরান্ড কাপ অনুষ্ঠিত হবে পাঁচটি শহরে—
*কলকাতা
*রাঁচি
*ইম্ফল
*গুয়াহাটি
*শিলং
প্রতিটি শহরেই গ্রুপ পর্বের ম্যাচ হবে। পাশাপাশি নক-আউট পর্বের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলিও বিভিন্ন ভেন্যুতে আয়োজন করা হয়েছে, যাতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ফুটবলপ্রেমীরা সরাসরি এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিযোগিতার স্বাদ নিতে পারেন।
কলকাতাতেই সবচেয়ে বেশি ম্যাচ
২০১৯ সালে ডুরান্ড কাপ কলকাতায় ফিরে আসার পর থেকেই শহরটি এই প্রতিযোগিতার প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
উদ্বোধনী ম্যাচ থেকে শুরু করে দুটি গ্রুপের লিগ পর্ব, দুটি কোয়ার্টার ফাইনাল, একটি সেমিফাইনাল এবং মহাফাইনাল—সব মিলিয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ হবে কলকাতাতেই।
যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন এবং কিশোর ভারতী ক্রীড়াঙ্গন মিলিয়ে প্রায় এক মাস ধরে ফুটবলের উৎসবে মেতে থাকবে শহর।
কলকাতা গ্রুপে কারা খেলছে?
কলকাতা গ্রুপে অংশ নিচ্ছে একাধিক ঐতিহ্যবাহী ও শক্তিশালী দল। তাদের মধ্যে রয়েছে—
*মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট
*ইস্টবেঙ্গল এফসি
*মহামেডান এসসি
*সাউথ ইউনাইটেড এফসি
*সিআইএসএফ ফুটবল দল
*ভারতীয় সেনা ফুটবল দল
*বাঘপত এফসি
*সমলেশ্বরী স্পোর্টিং
ফলে শুরু থেকেই একাধিক হাইভোল্টেজ ম্যাচ দেখার সুযোগ পাবেন দর্শকরা।
ডুরান্ড কাপে কার সাফল্য বেশি?
এই প্রশ্নের উত্তরই সবচেয়ে বেশি আগ্রহের।
ডুরান্ড কাপের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল ক্লাব এখনও মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট। সবুজ-মেরুন শিবির এখন পর্যন্ত ১৭ বার এই মর্যাদাপূর্ণ ট্রফি জিতেছে।
অন্যদিকে, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইস্টবেঙ্গল এফসি রয়েছে খুব কাছেই। লাল-হলুদ শিবিরের ঝুলিতে রয়েছে ১৬টি ডুরান্ড শিরোপা।
অর্থাৎ মাত্র একটি ট্রফির ব্যবধান দুই ঐতিহাসিক ক্লাবের মধ্যে। ফলে এবারের প্রতিযোগিতায় ইস্টবেঙ্গল চ্যাম্পিয়ন হলে দুই ক্লাবের শিরোপা সংখ্যা সমান হয়ে যাবে। আর মোহনবাগান ট্রফি জিতলে ব্যবধান আরও বাড়বে।
এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় কেন ডুরান্ড কাপের প্রতিটি মরসুমে কলকাতার দুই প্রধান ক্লাবকে ঘিরে এত আলোচনা হয়।
প্রথমবার আয়োজক রাঁচি
ডুরান্ড কাপের ইতিহাসে এবার নতুন সংযোজন রাঁচি।
২৬ জুলাই থেকে ১৬ অগাস্ট পর্যন্ত বিরসা মুন্ডা স্টেডিয়ামে গ্রুপ পর্বের ম্যাচ হবে। এখানেই অনুষ্ঠিত হবে একটি কোয়ার্টার ফাইনালও।
রাঁচিতে খেলবে—
*জামশেদপুর এফসি
*স্পোর্টিং ক্লাব দিল্লি
*ভারতীয় বায়ুসেনা
*শ্রীলঙ্কার ডিফেন্ডার্স এফসি
নতুন শহরে ডুরান্ডের আয়োজন ঘিরে স্থানীয় ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যেও উৎসাহ তুঙ্গে।
ফুটবলের প্রাণকেন্দ্র ইম্ফলেও থাকবে নজর
মণিপুর বহুদিন ধরেই ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম শক্তিকেন্দ্র। সেই কারণে ইম্ফলেও আয়োজন করা হচ্ছে একাধিক ম্যাচ। খুমান লাম্পাক স্টেডিয়ামে ২৮ জুলাই থেকে ১৭ অগাস্ট পর্যন্ত লিগ পর্বের খেলা হবে। স্থানীয় দুই জনপ্রিয় ক্লাব ট্রাউ এফসি এবং নেরোকা এফসি-র পাশাপাশি অংশ নেবে ভারতীয় নৌবাহিনী এবং অভিষেককারী এফসি রেংদাই।
শিলংয়ে উত্তর-পূর্বের ফুটবল উন্মাদনা
শিলংয়ের জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামেও অনুষ্ঠিত হবে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। ৩১ জুলাই থেকে ২০ অগাস্ট পর্যন্ত এখানে গ্রুপ পর্বের পাশাপাশি একটি সেমিফাইনালও হবে।
স্থানীয় ক্লাব শিলং লাজং, নংকশে স্পোর্টস, লাংসনিং এফসি এবং মুম্বাই এফসি-র অংশগ্রহণ উত্তর-পূর্ব ভারতের ফুটবল সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
গুয়াহাটিতে নর্থইস্ট ইউনাইটেডের মিশন
১ অগাস্ট থেকে ১৩ অগাস্ট পর্যন্ত গুয়াহাটির ইন্দিরা গান্ধী অ্যাথলেটিক স্টেডিয়ামে হবে গ্রুপ পর্বের ম্যাচ।
এখানে খেলবে—
*নর্থইস্ট ইউনাইটেড এফসি
*এফসি-১
*বোডোল্যান্ড এফসি
*কার্বি আংলং মর্নিং স্টার এফসি
টানা দুইবারের চ্যাম্পিয়ন নর্থইস্ট ইউনাইটেড এবারও নিজেদের সাফল্যের ধারা বজায় রাখতে চাইবে।
নক-আউট সূচিও চূড়ান্ত
আয়োজকরা নক-আউট পর্বের ভেন্যুও নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
চারটি কোয়ার্টার ফাইনাল হবে কলকাতা, রাঁচি, ইম্ফল এবং শিলংয়ে।
দুটি সেমিফাইনালের একটি অনুষ্ঠিত হবে শিলংয়ে এবং অন্যটি কলকাতায়।
সবশেষে ২৩ অগাস্ট যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে হবে শিরোপা নির্ধারণের মহারণ।
ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের লড়াই
ডুরান্ড কাপ শুধু ইতিহাসের স্মারক নয়, নতুন ফুটবলারদের নিজেদের প্রমাণ করার অন্যতম বড় মঞ্চও।
এখানে যেমন মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল কিংবা মহামেডানের মতো শতাব্দীপ্রাচীন ক্লাব নিজেদের ঐতিহ্য ধরে রাখার লড়াইয়ে নামে, তেমনই নতুন ও উদীয়মান ক্লাবগুলিও নিজেদের সামর্থ্য দেখানোর সুযোগ পায়।
তাই ডুরান্ড কাপের প্রতিটি ম্যাচে থাকে চমক, আবেগ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার আলাদা রং।
সূচি ঘোষণার পর থেকেই ফুটবলপ্রেমীদের আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। কে হবে এবারের চ্যাম্পিয়ন? মোহনবাগান কি আরও একটি ট্রফি জিতে নিজেদের রেকর্ড আরও সমৃদ্ধ করবে? নাকি ইস্টবেঙ্গল শিরোপা জিতে দীর্ঘদিনের ব্যবধান ঘুচিয়ে ১৭টি ডুরান্ড ট্রফির মালিক হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলবে আগামী এক মাসের লড়াই শেষে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—১৩৫তম ডুরান্ড কাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, ভারতীয় ফুটবলের ঐতিহ্য, আবেগ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার আরেকটি নতুন অধ্যায় লিখতে চলেছে।

