রাজ্যের পুলিশ ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ, জবাবদিহিমূলক এবং পেশাদার করে তুলতে সিভিক ভলান্টিয়ারদের জন্য নতুন মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত সিভিক ভলান্টিয়ারদের কাজের মান, শারীরিক সক্ষমতা, আইন সম্পর্কে ধারণা এবং জনসাধারণের সঙ্গে আচরণ—সবকিছুর উপর ভিত্তি করেই এবার মূল্যায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর। প্রশাসনের মতে, শুধু বাহিনীর সদস্যসংখ্যা বাড়ালেই আইনশৃঙ্খলা আরও শক্তিশালী হয় না। দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষিত, দক্ষ এবং দায়িত্বশীল কর্মী। সেই লক্ষ্যেই নতুন এই মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে যোগ্য ও কর্মদক্ষ সিভিক ভলান্টিয়ারদের চিহ্নিত করার পাশাপাশি বাহিনীর সামগ্রিক মানও উন্নত করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে প্রশাসন।
সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সিভিক ভলান্টিয়ারদের কর্মক্ষমতার ভিত্তিতে মূল্যায়নের কথা ঘোষণা করেন। সেই ঘোষণার পরই বিভিন্ন জেলায় প্রশাসনিক স্তরে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। ধাপে ধাপে গোটা রাজ্যেই একই ধরনের মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
প্রশাসনের বক্তব্য, এই মূল্যায়ন কোনও একমাত্র লিখিত পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং একজন সিভিক ভলান্টিয়ার বাস্তবে দায়িত্ব পালনের জন্য কতটা প্রস্তুত, সেটাই বিভিন্ন দিক থেকে যাচাই করা হবে।
কী কী থাকবে মূল্যায়নে?
নতুন মূল্যায়ন কাঠামোতে মোট ৫০ নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৫ নম্বর থাকবে শারীরিক সক্ষমতার জন্য এবং বাকি ২৫ নম্বর দেওয়া হবে পেশাগত দক্ষতা, সাধারণ জ্ঞান ও প্রশাসনিক সক্ষমতার ভিত্তিতে।
শারীরিক পরীক্ষায় দৌড়, ওঠবোস, সিট-আপ, উচ্চতা, ওজন এবং বুকের মাপের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী এক থেকে পাঁচ কিলোমিটার পর্যন্ত দৌড়ানোর সক্ষমতাও যাচাই করা হতে পারে। প্রতিটি পরীক্ষার জন্য আলাদা নম্বর নির্ধারণ থাকবে, যাতে মূল্যায়ন স্বচ্ছভাবে করা যায়।
অন্যদিকে, পেশাগত মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা, সাধারণ জ্ঞান, কম্পিউটার ব্যবহারের দক্ষতা, সরকারি দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে ব্যবহার—এই বিষয়গুলির উপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। প্রশাসনের ধারণা, বর্তমানে পুলিশের দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। তাই শুধুমাত্র মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা নয়, ডিজিটাল দক্ষতাও এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কেন আনা হচ্ছে এই মূল্যায়ন?
পুলিশ প্রশাসনের একাংশের মতে, অতীতে রাজনৈতিক সুপারিশের ভিত্তিতে বহু সিভিক ভলান্টিয়ার নিয়োগ হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগের আগে শিক্ষাগত যোগ্যতা কিংবা শারীরিক সক্ষমতার যথাযথ পরীক্ষা হয়নি বলেও দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়াও, সাধারণ মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, দায়িত্ব পালনে গাফিলতি কিংবা পেশাদারিত্বের অভাব নিয়ে সময় সময় অভিযোগ সামনে এসেছে। প্রশাসনের মতে, এই ধরনের অভিযোগের পুনরাবৃত্তি রোধ করতেই কর্মক্ষমতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন প্রয়োজন। তাদের বক্তব্য, যাঁরা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন, তাঁদের আলাদা করে চিহ্নিত করা গেলে ভবিষ্যতে প্রশিক্ষণ, দায়িত্ব বণ্টন এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রেও সুবিধা হবে।
কোন জেলায় শুরু হয়েছে প্রস্তুতি?
প্রশাসনিক সূত্রের খবর, মূল্যায়নের নম্বর বণ্টন এবং পরীক্ষার প্রাথমিক কাঠামো প্রথম তৈরি করেছে কোচবিহার জেলা পুলিশ। সেই মডেল অনুসরণ করেই অন্যান্য জেলাতেও একই ধরনের মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর প্রস্তুতি চলছে। যদিও এখনও রাজ্যজুড়ে একযোগে পরীক্ষার দিনক্ষণ ঘোষণা হয়নি, তবে ধাপে ধাপে সমস্ত জেলায় এই প্রক্রিয়া কার্যকর করা হবে বলেই প্রশাসনের পরিকল্পনা।
ফেল করলে কী হতে পারে?
এই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায়। প্রশাসনিক সূত্রের ইঙ্গিত, শারীরিক সক্ষমতা বা পেশাগত যোগ্যতায় নির্ধারিত মানের তুলনায় অনেক পিছিয়ে থাকা কর্মীদের ক্ষেত্রে পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। তবে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট দফতরের তরফে জানানো হয়েছে, মূল্যায়নের ফলাফল, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের সুযোগ এবং প্রশাসনিক বিবেচনা—সবকিছু খতিয়ে দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অর্থাৎ, শুধুমাত্র পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতেই তাৎক্ষণিকভাবে চাকরি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে—এমন কোনও সরকারি নির্দেশ এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। বরং মূল্যায়নের মাধ্যমে কার কোথায় ঘাটতি রয়েছে, সেটি চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দিকেই জোর দেওয়া হচ্ছে।
দক্ষতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর লক্ষ্য
বর্তমান সময়ে পুলিশের সঙ্গে সাধারণ মানুষের যোগাযোগ অনেকটাই বেড়েছে। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, জনসমাগমে নিরাপত্তা, বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে সহায়তা—বিভিন্ন দায়িত্বে সিভিক ভলান্টিয়ারদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এই কারণেই তাঁদের পেশাগত দক্ষতা, শৃঙ্খলা এবং দায়িত্ববোধ আরও উন্নত করার উপর জোর দিচ্ছে প্রশাসন। নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতির মাধ্যমে দক্ষ কর্মীদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, সিভিক ভলান্টিয়ার বাহিনীকে আরও কার্যকর, প্রশিক্ষিত এবং জনবান্ধব করে তোলাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চালু হলে রাজ্যের পুলিশ ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা ও কর্মদক্ষতার ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে বলেই প্রশাসনিক মহলের ধারণা। এখন নজর থাকবে, কবে আনুষ্ঠানিকভাবে এই মূল্যায়নের সময়সূচি ঘোষণা করা হয় এবং তার ভিত্তিতে ভবিষ্যতে কী ধরনের প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

