শুধু রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে নথিতে সই করলেই কি হিন্দু বিবাহ আইন অনুযায়ী বিয়ে সম্পূর্ণ বৈধ বলে গণ্য হবে? এই প্রশ্ন ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করল গুজরাট হাই কোর্ট। আদালতের মতে, হিন্দু বিবাহ কেবল একটি আইনি চুক্তি নয়; এটি ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে স্বীকৃত একটি সংস্কার। তাই প্রচলিত ধর্মীয় রীতিনীতি পালন না করলে শুধুমাত্র রেজিস্ট্রেশন বা আনুষ্ঠানিক কাগজপত্রের ভিত্তিতে সেই বিবাহকে বৈধ বলা যাবে না।
এই মন্তব্য একটি নির্দিষ্ট মামলার শুনানির সময় করা হলেও, রায়ের পর থেকেই বিষয়টি আইনজীবী মহল থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে, যখন অনেক দম্পতি সহজ ও দ্রুত প্রক্রিয়ার জন্য শুধুমাত্র রেজিস্ট্রি বিবাহের পথ বেছে নেন, তখন আদালতের এই পর্যবেক্ষণ নতুন করে আইনি প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
আদালত কী বলেছে?
বিচারপতি ইলেশ ভোরা এবং বিচারপতি টি. বচ্চনির ডিভিশন বেঞ্চ পর্যবেক্ষণে জানায়, হিন্দু বিবাহকে শুধুমাত্র একটি সামাজিক অনুষ্ঠান হিসেবে দেখলে ভুল হবে। আদালতের মতে, এটি এমন একটি ধর্মীয় সংস্কার, যার মাধ্যমে দুই ব্যক্তি পারস্পরিক দায়িত্ব, সম্মান, বিশ্বাস এবং আজীবন একসঙ্গে থাকার অঙ্গীকারে আবদ্ধ হন।
বেঞ্চের মতে, হিন্দু বিবাহ আইনে বিয়ের বৈধতার জন্য সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের প্রচলিত ধর্মীয় রীতি পালন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধুমাত্র নথিতে সই করা বা আনুষ্ঠানিক রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করাই যথেষ্ট নয়, যদি আইনে নির্ধারিত প্রয়োজনীয় বিবাহ-সংস্কার সম্পন্ন না হয়।
হিন্দু বিবাহ আইনের ৭ নম্বর ধারার ব্যাখ্যা
রায়ে আদালত বিশেষভাবে হিন্দু বিবাহ আইনের ৭ নম্বর ধারার উল্লেখ করেছে। ওই ধারায় বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের প্রচলিত রীতি ও আচার অনুযায়ী বিবাহ সম্পন্ন হলেই সেটি আইনত বৈধ হিসেবে গণ্য হবে।
আদালতের মতে, বহু হিন্দু সম্প্রদায়ে সপ্তপদী, অর্থাৎ অগ্নিকে সাক্ষী রেখে সাত পা একসঙ্গে হাঁটার প্রথা, বিবাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই আচার সম্পন্ন হওয়ার পরই বিবাহ সম্পূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। তবে আদালত একই সঙ্গে ইঙ্গিত দিয়েছে যে, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নিজস্ব বৈধ ও স্বীকৃত বিবাহ-রীতি থাকলে সেগুলিও প্রাসঙ্গিক হতে পারে। অর্থাৎ, মূল বিষয়টি হল সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের স্বীকৃত ধর্মীয় আচার পালন।
বিচারপতিরা আরও বলেন, বিবাহ কেবল ভোজ, সাজসজ্জা কিংবা সামাজিক উৎসব নয়; এটি এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যা দুই মানুষের সম্পর্ককে ধর্মীয়, সামাজিক এবং আইনগত স্বীকৃতি দেয়।
কোন মামলায় এই পর্যবেক্ষণ?
এই মামলার সূত্রপাত এক ব্রিটিশ-নিবাসী ভারতীয় নাগরিকের অভিযোগ থেকে। তাঁর দাবি, এক মহিলা প্রতারণার মাধ্যমে তাঁকে বিবাহ সংক্রান্ত নথিতে স্বাক্ষর করিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, তিনি কখনও স্বেচ্ছায় ওই বিবাহে সম্মতি দেননি এবং তাঁদের মধ্যে কোনও ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে বিয়েও হয়নি।
আবেদনকারীর আরও দাবি, তাঁরা কখনও স্বামী-স্ত্রী হিসেবে একসঙ্গে বসবাসও করেননি। মামলার শুনানিতে সংশ্লিষ্ট মহিলাও স্বীকার করেন যে, তাঁদের মধ্যে প্রচলিত ধর্মীয় আচার অনুসারে বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে আদালত নথি, বক্তব্য এবং আইনি বিধান পর্যালোচনা করে জানায়, যেহেতু বিবাহের মৌলিক ধর্মীয় রীতিই পালন করা হয়নি, তাই হিন্দু বিবাহ আইনের আলোকে ওই সম্পর্ককে বৈধ বিবাহ হিসেবে গণ্য করা যাবে না।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই রায়?
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পর্যবেক্ষণ মূলত হিন্দু বিবাহ আইনের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আদালত স্পষ্ট করেছে যে, হিন্দু বিবাহের ক্ষেত্রে শুধু প্রশাসনিক বা নথিগত প্রক্রিয়া নয়, আইন স্বীকৃত ধর্মীয় রীতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। ভারতে বিশেষ বিবাহ আইন (Special Marriage Act)-এর অধীনে সম্পন্ন হওয়া বিবাহের ক্ষেত্রে নিয়ম ভিন্ন। সেই আইনে নির্ধারিত প্রক্রিয়া মেনে বিবাহ নিবন্ধিত হলে আলাদা ধর্মীয় অনুষ্ঠান বাধ্যতামূলক নয়। তাই গুজরাট হাই কোর্টের এই পর্যবেক্ষণকে সব ধরনের বিবাহের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
সমাজ ও আইনের সংযোগ
ভারতের পারিবারিক আইন বহু ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ধর্মীয় আইনের সঙ্গে যুক্ত। ফলে বিবাহ, উত্তরাধিকার কিংবা পারিবারিক সম্পর্ক সংক্রান্ত নানা বিষয়ে ধর্মীয় প্রথা ও আইনি বিধানের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
গুজরাট হাই কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ সেই বিষয়টিকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। আদালতের মতে, বিবাহ শুধুমাত্র দুই ব্যক্তির আইনি সম্পর্ক নয়; এটি পারস্পরিক দায়িত্ব, সামাজিক স্বীকৃতি এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অংশ।
ফলে হিন্দু বিবাহের ক্ষেত্রে কেবল রেজিস্ট্রেশন করলেই সমস্ত আইনি শর্ত পূরণ হয়ে যায়—এমন ধারণা সব পরিস্থিতিতে সঠিক নয়। সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান এবং প্রচলিত ধর্মীয় রীতিনীতি—উভয় বিষয়ই বিবেচ্য হতে পারে।
এই পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যতে একই ধরনের মামলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলেই আইনজীবী মহলের একাংশ মনে করছেন। তবে প্রতিটি মামলার বাস্তব পরিস্থিতি এবং প্রযোজ্য আইন ভিন্ন হতে পারে। তাই বিবাহ সংক্রান্ত কোনও আইনি জটিলতা দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়াই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত।

