কালীঘাট থেকে দক্ষিণেশ্বর ট্রামে! যানজট কমাতে বদলাবে ট্র্যাকের নকশা

NEWS INDIA বাংলা
0
Kolkata tram project Kalighat Dakshineswar new route AC tram



কলকাতার ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক পরিবহণ ব্যবস্থার মেলবন্ধন ঘটাতে বড় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে রাজ্য সরকার। বহুদিন ধরেই শহরে ট্রাম পরিষেবা টিকিয়ে রাখা এবং নতুনভাবে জনপ্রিয় করে তোলার নানা উদ্যোগের কথা শোনা যাচ্ছিল। এবার সেই উদ্যোগে যোগ হল আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা। কালীঘাট ও দক্ষিণেশ্বর—শহরের দুই ঐতিহাসিক ও জনপ্রিয় তীর্থস্থানকে ট্রামপথে যুক্ত করার ভাবনা প্রকাশ করল রাজ্য সরকার।


পরিবহণমন্ত্রী অর্জুন সিং জানিয়েছেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কলকাতার ধর্মীয় পর্যটনের পাশাপাশি নগর পরিবহণেও নতুন দিগন্ত খুলতে পারে। শুধু তাই নয়, ট্রামকে ঘিরে দীর্ঘদিনের সবচেয়ে বড় অভিযোগ—যানজট—সেটিও দূর করতে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। রাস্তার মাঝখান দিয়ে নয়, নতুন নকশায় রাস্তার এক পাশ ঘেঁষে ট্রামলাইন বসানোর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।



পার্ক স্ট্রিটে একটি বণিকসভা আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে পরিবহণমন্ত্রী জানান, সরকারের লক্ষ্য শুধু পুরনো ট্রাম পরিষেবা চালু রাখা নয়, বরং তাকে আধুনিক, আরামদায়ক এবং সময়োপযোগী পরিবহণ ব্যবস্থায় রূপান্তর করা। সেই ভাবনার অংশ হিসেবেই কালীঘাট ও দক্ষিণেশ্বরের মধ্যে নতুন ট্রাম রুট চালুর প্রস্তাব সামনে এসেছে।


এই দুই মন্দিরে সারা বছরই রাজ্যের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য ভক্ত ও পর্যটক আসেন। বিশেষ উৎসবের সময়ে যাত্রীসংখ্যা আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সরকার মনে করছে, ট্রাম পরিষেবা চালু হলে একদিকে যেমন যাতায়াত সহজ হবে, তেমনই ধর্মীয় পর্যটনেও নতুন মাত্রা যোগ হবে।



কলকাতার ট্রাম নিয়ে সবচেয়ে বেশি যে অভিযোগ শোনা যায়, তা হল ধীরগতির কারণে যানজট তৈরি হওয়া। এই সমস্যার সমাধানেই নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পরিবহণমন্ত্রী। তাঁর কথায়, ভবিষ্যতের ট্রাম আর আগের মতো রাস্তার মাঝ বরাবর চলবে না। পরিবর্তে রাস্তার বাঁ দিক বরাবর আলাদা করিডর বা নির্দিষ্ট ট্র্যাক তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে সাধারণ যানবাহনের চলাচলে কম বাধা সৃষ্টি হবে এবং ট্রামও নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে পারবে। সরকারি সূত্রের মতে, প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন ট্র্যাক নির্মাণ এবং রাস্তার নকশায় পরিবর্তন আনার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।



শুধু রুট বাড়ানো নয়, ট্রামের মানও উন্নত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। পরিবহণমন্ত্রী জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে শহরের রাস্তায় আধুনিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বা এসি ট্রাম নামানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নতুন ট্রামগুলিতে যাত্রীদের আরাম, নিরাপত্তা এবং আধুনিক প্রযুক্তির উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। এতে একদিকে যেমন নিয়মিত যাত্রীরা উপকৃত হবেন, অন্যদিকে কলকাতায় আসা দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছেও ট্রাম আবার আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।



সরকারের পরিকল্পনা শুধু এই একটি রুটেই সীমাবদ্ধ নয়। পরিবহণমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী দিনে সল্টলেক, নিউটাউন এবং রাজারহাটের মতো দ্রুত বিকাশমান এলাকাতেও ট্রাম পরিষেবা চালুর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে নিউটাউন ও সল্টলেকে প্রশস্ত রাস্তা এবং পরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে আধুনিক ট্রাম করিডর তৈরির সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছে প্রশাসন। এতে পরিবেশবান্ধব গণপরিবহণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।



এই বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য বিশেষজ্ঞ সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, ট্রাম পরিষেবা পুনরুজ্জীবিত করার রূপরেখা তৈরিতে RITES-কে (Rail India Technical and Economic Service) সমীক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।


সমীক্ষায় সম্ভাব্য রুট, যাত্রীসংখ্যা, অবকাঠামোগত প্রয়োজন, ব্যয়, ট্রাফিকের উপর প্রভাব এবং ভবিষ্যতের সম্প্রসারণ—সব দিকই খতিয়ে দেখা হবে। ইতিমধ্যেই সমীক্ষার কাজ শুরু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতেই পরবর্তী পর্যায়ে প্রকল্পের বিস্তারিত পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হবে।



ট্রামের পাশাপাশি রাজ্যের বাস পরিষেবাও আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিবহণমন্ত্রী জানিয়েছেন, খুব শীঘ্রই রাজ্যের পরিবহণ বহরে নতুন করে ৪৭০টি সরকারি বাস যুক্ত হবে। এই নতুন বাসগুলি চালু হলে বিভিন্ন রুটে পরিষেবার সংখ্যা বাড়বে এবং যাত্রীদের অপেক্ষার সময়ও কমবে বলে প্রশাসনের আশা। পুরনো বাসগুলির পাশাপাশি নতুন বাসও চলবে, ফলে গণপরিবহণের সামগ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। সরকারের দাবি, বাস ও ট্রাম—দুই ক্ষেত্রেই সমান্তরাল উন্নয়নের মাধ্যমে শহরের গণপরিবহণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও যাত্রীবান্ধব করে তোলা হবে।



প্রায় দেড়শো বছরেরও বেশি সময় ধরে কলকাতার পরিচয়ের অন্যতম অংশ ট্রাম। একসময় শহরের দৈনন্দিন যাতায়াতের প্রধান মাধ্যমগুলির মধ্যে এটি অন্যতম ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ট্রামের পরিধি কমলেও তার ঐতিহ্য এখনও অমলিন।


পরিবেশবান্ধব এই গণপরিবহণ ব্যবস্থাকে নতুন প্রযুক্তি, আধুনিক অবকাঠামো এবং উন্নত পরিষেবার মাধ্যমে আবারও জনপ্রিয় করে তুলতে চায় রাজ্য সরকার। কালীঘাট-দক্ষিণেশ্বর ট্রাম প্রকল্প সেই বৃহত্তর পরিকল্পনারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।


তবে আপাতত প্রকল্পটি পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে। সমীক্ষা শেষ হওয়ার পর রুট, ব্যয়, নির্মাণকাজ এবং পরিষেবা চালুর সময়সূচি সম্পর্কে সরকার বিস্তারিত ঘোষণা করতে পারে। যদি পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বহু বছর পর কলকাতার ট্রাম পরিষেবা নতুন রূপে শহরের পরিবহণ ব্যবস্থায় আবারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!