NRS হাসপাতালে নার্সের রহস্যমৃত্যু: নাইট ডিউটির মাঝে শৌচাগারে উদ্ধার দেহ, তদন্তে একাধিক প্রশ্ন
কলকাতার NRS মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নাইট ডিউটির মাঝে এক নার্সের রহস্যমৃত্যু ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। মেটারনিটি বিভাগের HDU-এর শৌচাগার থেকে তাঁকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পরে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।
কলকাতা : কলকাতার নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল বা NRS-এ এক নার্সের রহস্যমৃত্যুকে ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। বুধবার রাতে নাইট ডিউটিতে থাকা ৩০ বছর বয়সি ওই নার্সকে হাসপাতালের মেটারনিটি বিভাগের হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটের (HDU) শৌচাগারে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পর কলকাতা পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনও নিশ্চিত নয় এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বুধবার রাতে ওই নার্স ডিউটিতে ছিলেন। রাত আনুমানিক ৯টা ৪০ মিনিটের পর তাঁকে আর দেখা যাচ্ছিল না বলে সহকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। দীর্ঘক্ষণ তাঁর কোনও খোঁজ না পাওয়ায় সহকর্মীরা হাসপাতালের বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ শুরু করেন। পরে একটি শৌচাগারের দরজা দীর্ঘ সময় ধরে ভিতর থেকে বন্ধ দেখতে পান তাঁরা। দরজায় ডাকাডাকি করেও কোনও সাড়া না মেলায় শেষ পর্যন্ত দরজা ভেঙে ভিতরে ঢোকা হয়। সেখানেই নার্সকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনাটি সামনে আসার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পুলিশকে খবর দেয়। শৌচাগারটি ঘিরে তদন্ত শুরু হয় এবং ঘটনাস্থল থেকে কিছু সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। Hindustan Times-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখানে কিছু খালি অ্যানাস্থেটিক ইনজেকশনের ভায়াল এবং একটি সিরিঞ্জ পাওয়া গিয়েছে। তবে ওই সামগ্রী কীভাবে মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত, তা এখনও তদন্তের বিষয়। পুলিশ নার্সটির মোবাইল ফোনও পরীক্ষা করছে এবং কল রেকর্ড ও অন্যান্য তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বাংলা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, নার্সটি শৌচাগারে যাওয়ার সময় ফেন্টানিলের তিনটি ভায়াল সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। প্রাথমিকভাবে অতিরিক্ত ওষুধ ব্যবহারের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এটি আত্মহত্যা ছিল, নাকি অন্য কোনও কারণে মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছয়নি তদন্তকারী সংস্থা। কোনও সুইসাইড নোটও উদ্ধার হয়নি বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে।
মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট। পাশাপাশি ঘটনাস্থলের ফরেন্সিক পরীক্ষা, নার্সটির মোবাইল ফোনের তথ্য, কল রেকর্ড, সহকর্মীদের বক্তব্য এবং তাঁর ডিউটির সময়কার গতিবিধি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীরা জানতে চাইছেন, ডিউটির সময় তিনি কারও সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন কি না, শৌচাগারে যাওয়ার আগে তাঁর আচরণে কোনও অস্বাভাবিকতা ছিল কি না এবং তাঁর কাছে ওষুধ কীভাবে পৌঁছল।
ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলিতে চিকিৎসক ও নার্সদের নিরাপত্তা নিয়ে গত দু’বছর ধরে প্রবল আলোচনা চলছে। ২০২৪ সালের আরজি কর কাণ্ডের পর হাসপাতালের নিরাপত্তা, নজরদারি, কর্মীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠেছিল। সেই প্রেক্ষাপটে NRS-এর মতো বড় সরকারি হাসপাতালে নাইট ডিউটির সময় এক নার্সের মৃত্যু স্বাভাবিকভাবেই নতুন করে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে বর্তমান ঘটনায় কোনও নিরাপত্তা-গাফিলতি বা অপরাধের অভিযোগ এখনও তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।
NRS কর্তৃপক্ষের সামনে এখন দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ স্পষ্ট করা। দ্বিতীয়ত, হাসপাতালের কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে যদি কোনও দুর্বলতা ধরা পড়ে, তা চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া। কারণ এই ঘটনায় শুধু একজন নার্সের আকস্মিক মৃত্যু নয়, সরকারি হাসপাতালের কর্মপরিবেশ এবং রাতের ডিউটিতে থাকা স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে।
এই মুহূর্তে মৃত্যুর কারণ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সুযোগ নেই। ময়নাতদন্ত, ফরেন্সিক পরীক্ষা এবং পুলিশের তদন্ত শেষ হওয়ার পরই রহস্যের প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হতে পারে।

