হরমুজ সংকটে ফের বাড়ছে ক্রুড অয়েলের দাম, ভারতের অর্থনীতিতে বাড়ছে চাপের আশঙ্কা
হরমুজে অচলাবস্থা, বাড়ছে তেলের দাম, ভারতের বাজারে কতটা পড়তে পারে প্রভাব?
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা নতুন করে তীব্র হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ফের উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz)-তে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় অপরিশোধিত তেলের (Crude Oil) সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক বাজারে। ১৪ আগস্টের লেনদেনে Brent crude প্রায় ৬ শতাংশ সাপ্তাহিক বৃদ্ধির পথে ছিল এবং WTI crude একদিনে ১.১৫ ডলার বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮২.৪০ ডলারে পৌঁছয়।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহণপথ হরমুজ প্রণালী। মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদক দেশগুলির কাছ থেকে এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে অপরিশোধিত তেল পরিবহণের ক্ষেত্রে এই জলপথের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ফলে সামরিক উত্তেজনা বা ট্যাঙ্কার চলাচলে বাধা তৈরি হলে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয় এবং বাজারে দাম বাড়ার চাপ তৈরি হয়। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ট্যাঙ্কার হামলা ও হরমুজ ঘিরে অচলাবস্থা তেলের বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে।
এই পরিস্থিতিতে এশিয়ার বিভিন্ন রিফাইনারি বিকল্প উৎস থেকে অপরিশোধিত তেল সংগ্রহের দিকে ঝুঁকছে। Reuters-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও তাইওয়ানের একাধিক সংস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য অঞ্চল থেকে অতিরিক্ত crude oil কিনছে। সরবরাহ নিশ্চিত করতে ভারতীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা HPCL এবং MRPL-ও নতুন করে crude কেনার টেন্ডার দিয়েছে।
ভারতের জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দেশের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের উপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে crude-এর দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে ভারতের আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। তার প্রভাব পড়তে পারে চলতি হিসাবের ভারসাম্য, বাণিজ্য ঘাটতি এবং টাকার বিনিময়মূল্যের উপর। তেলের দাম বাড়লে পরিবহণ ও উৎপাদন খরচও বাড়ার সম্ভাবনা থাকে, যার পরোক্ষ প্রভাব বিভিন্ন পণ্য ও পরিষেবার দামে পড়তে পারে।
ইতিমধ্যেই ভারতের খুচরো মূল্যস্ফীতি (Retail Inflation) জুলাইয়ে ৪.৪৫ শতাংশে পৌঁছেছে। Reuters-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, খাদ্যদ্রব্যের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি উচ্চ জ্বালানি ব্যয়ও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির উপর চাপ তৈরি করছে। ফলে হরমুজ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে কি না, সেটিই এখন অর্থনীতিবিদদের নজরে।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে crude-এর দাম বাড়লেই ভারতে সঙ্গে সঙ্গে পেট্রল-ডিজেলের দাম বাড়বে, এমনটা নয়। দেশে খুচরো জ্বালানির দাম নির্ধারণে আন্তর্জাতিক crude-এর পাশাপাশি কর কাঠামো, রিফাইনারি ও তেল বিপণন সংস্থার সিদ্ধান্ত এবং সরকারি নীতির মতো একাধিক বিষয় কাজ করে। ১৬ আগস্ট কলকাতাসহ বড় শহরগুলিতে পেট্রল-ডিজেলের দামে তাৎক্ষণিক কোনও বড় পরিবর্তন দেখা যায়নি।
তবে সংকট দীর্ঘায়িত হলে প্রভাব শুধু পেট্রল বা ডিজেলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিমান জ্বালানি, পরিবহণ, রাসায়নিক শিল্প, প্লাস্টিক, সার এবং বিভিন্ন উৎপাদন খাতে খরচ বাড়তে পারে। বিশেষ করে বিকল্প উৎস থেকে বেশি দামে crude সংগ্রহ করতে হলে ভারতীয় রিফাইনারিগুলির উপরও বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
এই কারণেই এখন নজর হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতির দিকে। সরবরাহ ব্যবস্থা দ্রুত স্বাভাবিক হলে আন্তর্জাতিক বাজারে চাপ কমতে পারে। কিন্তু উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ট্যাঙ্কার চলাচল আরও ব্যাহত হলে crude oil-এর দাম আরও অস্থির হতে পারে। সেক্ষেত্রে ভারতের অর্থনীতিতে আমদানি ব্যয়, মুদ্রা ও মূল্যস্ফীতির উপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

