দার্জিলিং পাহাড়ে স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের পথে কেন্দ্র, গোর্খা ইস্যুতে নতুন কমিটি গঠন
গোর্খা পরিচয় ও পাহাড়ের রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে নতুন উদ্যোগ কেন্দ্রের, সামনে বড় প্রশ্ন
দার্জিলিং পাহাড়ে দীর্ঘদিনের গোর্খা পরিচয় এবং রাজনৈতিক দাবিকে ঘিরে ফের সক্রিয় কেন্দ্রীয় সরকার। পশ্চিমবঙ্গের পাহাড়ি এলাকার দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সমস্যার একটি ‘স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান’ (Permanent Political Solution) খুঁজতে নতুন কমিটি গঠন করেছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। ২২ আগস্ট শিলিগুড়িতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে গোর্খা প্রতিনিধিদের এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পর এই সিদ্ধান্ত সামনে আসে।
তবে কেন্দ্রের এই উদ্যোগকে সরাসরি পৃথক ‘গোর্খাল্যান্ড’ রাজ্য গঠনের কমিটি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কেন্দ্রের ঘোষিত লক্ষ্য হল গোর্খা পরিচয়, সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং পাহাড়ের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজে বের করা। অর্থাৎ, পৃথক রাজ্যের দাবির পাশাপাশি সংবিধানের (Constitution) কাঠামোর মধ্যে অন্য কোনও রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সমাধানের সম্ভাবনাও আলোচনায় থাকতে পারে।
কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নতুন কমিটির নেতৃত্বে থাকছেন প্রাক্তন ডেপুটি ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার (Deputy National Security Adviser) এবং গোর্খা বিষয়ক ইন্টারলোকিউটর পঙ্কজ কুমার সিং। তাঁর নেতৃত্বাধীন কমিটির দায়িত্ব হবে একটি চূড়ান্ত চুক্তির খসড়া (Draft Agreement) তৈরি করা এবং সেই চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদ্ধতি বা ‘modalities’ নির্ধারণ করা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অবস্থান অনুযায়ী, গোর্খা সমস্যা সমাধানের পথ ভারতের সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই খোঁজা হবে।
দার্জিলিং পাহাড়ের রাজনৈতিক দাবির ইতিহাস অবশ্য এক শতাব্দীরও বেশি পুরনো। পৃথক প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের দাবি নিয়ে ১৯০৭ সাল থেকেই বিভিন্ন পর্যায়ে আবেদন ও আন্দোলন হয়েছে। ১৯৮০-র দশকে সেই আন্দোলন তীব্র আকার নেয়। ১৯৮৮ সালের চুক্তির পর গঠিত হয় দার্জিলিং গোর্খা হিল কাউন্সিল (DGHC)। পরে ২০১১ সালের চুক্তির ভিত্তিতে তৈরি হয় গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (GTA)। কিন্তু এই দুই প্রশাসনিক ব্যবস্থার কোনওটিই পাহাড়ের দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অসন্তোষের সম্পূর্ণ সমাধান করতে পারেনি।
কেন্দ্রের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের গুরুত্ব এখানেই। ২০২৬ সালের মার্চে লোকসভায় দেওয়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, দার্জিলিং পাহাড়, তরাই এবং ডুয়ার্সের গোর্খা-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কেন্দ্রীয় ইন্টারলোকিউটরকে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সম্ভাব্য সমাধানের পথ এবং রোডম্যাপের পরামর্শ দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। গোর্খাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিষয়ও সেই আলোচনার অংশ ছিল।
নতুন কমিটি সেই প্রক্রিয়াকেই আরও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কাঠামোর দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। ফলে পাহাড়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের অবস্থান এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পৃথক গোর্খাল্যান্ড রাজ্যের দাবি এবং সংবিধানের আওতায় বিকল্প রাজনৈতিক সমাধানের মধ্যে কীভাবে সমন্বয় করা হবে, সেটিই আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলির একটি।
তবে এই মুহূর্তে পৃথক গোর্খাল্যান্ড রাজ্য গঠনের সিদ্ধান্ত হয়ে গিয়েছে—এমন দাবি করার মতো কোনও তথ্য নেই। বরং কেন্দ্রের ঘোষিত অবস্থান হল, সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে গোর্খা পরিচয় এবং পাহাড়ের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধানের জন্য চূড়ান্ত চুক্তির রূপরেখা তৈরি করা।
এখন নজর থাকবে নতুন কমিটির বৈঠক, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা এবং কেন্দ্রের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগ পাহাড়ের রাজনৈতিক সমীকরণে কতটা পরিবর্তন আনে এবং দীর্ঘদিনের দাবির কতটা বাস্তব সমাধান তৈরি করতে পারে, সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।


