বাংলায় বদলে যাচ্ছে রাজনৈতিক সমীকরণ, তৃণমূলের অন্দরের বিদ্রোহেই বাড়ছে নতুন চ্যালেঞ্জ
বিধানসভা ভোটের পর বাংলার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ, তৃণমূলের ভিতরের লড়াই এখন বড় প্রশ্ন
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে যে পরিবর্তন শুরু হয়েছে, তা এখন আর শুধুমাত্র বিজেপি বনাম তৃণমূল কংগ্রেসের প্রচলিত দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নেই। বরং প্রধান বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনই রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একদিকে ২০৭টি আসন নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিজেপি, অন্যদিকে ৮০টি আসন পাওয়া তৃণমূলের ভিতরে নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রকাশ্য বিরোধ তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত ফলেও এই সংখ্যাই রয়েছে।
নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর তৃণমূলের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের পাশাপাশি বিধায়কদলের উপর সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা। দলের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহে বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে রেখে একটি পৃথক শক্তিকেন্দ্র তৈরি হয়েছে। বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, ৫৮ জন বিধায়ক তাঁদের পাশে রয়েছেন। সংখ্যাটি তৃণমূলের মোট ৮০ বিধায়কের তুলনায় যথেষ্ট বড় হলেও এটি বিদ্রোহী শিবিরের দাবি—তাই সেটিকে দলের চূড়ান্ত সাংগঠনিক অবস্থান হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
এই সংঘাত সবচেয়ে স্পষ্ট হয়েছে বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার পদকে কেন্দ্র করে। স্পিকার ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর তাঁর নিয়োগ চ্যালেঞ্জ করে আদালতের দ্বারস্থ হয় তৃণমূলের একাংশ। বিষয়টি নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে দীর্ঘ আইনি লড়াই চলে। ১৮ আগস্টের শুনানির পরও ঋতব্রতই বিরোধী দলনেতার পদে বহাল রয়েছেন বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলিতে জানানো হয়েছে। ফলে আদালতের লড়াইয়ের পাশাপাশি তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ বিভাজনও আরও প্রকাশ্যে এসেছে।
এই পরিস্থিতির রাজনৈতিক সুবিধা স্বাভাবিকভাবেই বিজেপির দিকে যেতে পারে। ২০৭টি আসন নিয়ে ক্ষমতায় থাকা বিজেপির কাছে দুর্বল বিরোধী শিবির প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক—দুই ক্ষেত্রেই সুবিধা তৈরি করতে পারে। তবে এখানেও ঝুঁকি রয়েছে। বিরোধী দলের ভাঙনকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর পাশাপাশি সরকারকে কর্মসংস্থান, শিল্প, আইনশৃঙ্খলা, পরিকাঠামো ও নাগরিক পরিষেবার মতো বাস্তব প্রশাসনিক প্রশ্নের মোকাবিলা করতে হবে।
অন্যদিকে তৃণমূলের সামনে প্রশ্ন শুধু দলীয় নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ নয়, বিধায়ক ও সংগঠনের মধ্যে সমন্বয় ধরে রাখাও। দীর্ঘস্থায়ী বিভাজন হলে তার প্রভাব বিধানসভার বাইরে জেলা সংগঠন, পুরসভা, পঞ্চায়েত এবং স্থানীয় নেতৃত্বের উপরও পড়তে পারে। তবে বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে এখনই একটি পূর্ণাঙ্গ পৃথক রাজনৈতিক দল বা স্থায়ী জোট হিসেবে চিহ্নিত করা তাড়াহুড়ো হবে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বিজেপি, তৃণমূলের মূল নেতৃত্ব এবং বিদ্রোহী তৃণমূল বিধায়কদের রাজনৈতিক লক্ষ্য এক নয়। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিকে সরাসরি ‘ত্রিমুখী জোট’ বলার বদলে বহুমুখী রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস বলা বেশি যুক্তিযুক্ত।
সব মিলিয়ে, ২০২৬-এর নির্বাচনের পর বাংলার রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদলের পাশাপাশি তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সংকটই এখন বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন। বিজেপি সরকার কতটা শক্তিশালীভাবে প্রশাসন চালাতে পারে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কতটা দ্রুত দলের নিয়ন্ত্রণ পুনর্গঠন করতে পারেন এবং ঋতব্রত-নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবির কতটা দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক শক্তি তৈরি করতে পারে—এই তিনটি প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্র নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

