যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী ভবনে যজ্ঞ, রিপোর্ট তলব উপাচার্যের
অনুমতি ছাড়াই অগ্নিসংযোগের অভিযোগ, প্রশাসনিক পদক্ষেপ ঘিরে বাড়ছে বিতর্ক
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ঐতিহ্যবাহী ভবনের সামনে যজ্ঞের আয়োজনকে ঘিরে প্রশাসনিক মহলে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অনুষ্ঠানে পূর্বানুমতি ছাড়াই আগুন জ্বালানো হয়েছিল কি না, বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত নিয়ম মানা হয়েছিল কি না এবং ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা হয়েছিল, সেই সব প্রশ্ন এখন সামনে। ঘটনার বিস্তারিত জানতে উপাচার্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক আধিকারিকের কাছে রিপোর্ট তলব করেছেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী ভবনের সামনে যজ্ঞের আয়োজনকে কেন্দ্র করে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওই অনুষ্ঠানে খোলা জায়গায় আগুন জ্বালানো হয়। বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যনির্বাহী রেজিস্ট্রার সেলিম বক্স মণ্ডল। তাঁর বক্তব্য ছিল, ঐতিহ্যবাহী ভবনের সামনে কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া আগুন জ্বালানো উচিত নয়। পরে তিনি বিষয়টি নিয়ে উপাচার্যের কাছে একটি রিপোর্ট জমা দেন বলে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের বরাত দিয়ে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এর পরেই প্রশাসনিক স্তরে বিষয়টি গুরুত্ব পায়। উপাচার্যের নির্দেশে এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে, অনুষ্ঠানটি কীভাবে আয়োজিত হয়েছিল, কারা এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া হয়েছিল কি না এবং আয়োজনের সময় নির্ধারিত নিরাপত্তাবিধি মেনে চলা হয়েছিল কি না। একই সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী ভবনের সামনে এমন অনুষ্ঠান করার ক্ষেত্রে সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনও বিধি লঙ্ঘিত হয়েছে কি না, সেটিও রিপোর্টে উঠে আসতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আগুন জ্বালিয়ে কোনও অনুষ্ঠান আয়োজনের বিষয়টি প্রশাসনের কাছে স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক পড়ুয়া, শিক্ষক ও কর্মী যাতায়াত করেন। ফলে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি এড়াতে খোলা আগুন ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং অনুমতির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। তার সঙ্গে যদি কোনও পুরনো বা ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা যুক্ত থাকে, তাহলে ভবনের কাঠামো, আশপাশের অংশ এবং সংরক্ষণবিধির প্রশ্নও সামনে আসে।
এই ঘটনায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ধর্মীয় বা অ-শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান আয়োজনের নিয়ম। ধর্মীয় আচার পালনের অধিকার নিয়ে সামাজিক বিতর্ক থাকলেও, যে কোনও অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক বিধি এবং নিরাপত্তা নির্দেশিকা মানা হয়েছে কি না, সেটিই এখন তদন্তের কেন্দ্রে। প্রশাসনের রিপোর্টে সেই বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।
প্রশাসনিক তদন্তের ক্ষেত্রে তাই শুধু অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য নয়, আয়োজনের পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কোথায় আগুন জ্বালানো হয়েছিল, কতক্ষণ অনুষ্ঠান চলেছিল, কোনও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল কি না এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আগে থেকে জানানো হয়েছিল কি না, এমন একাধিক প্রশ্নের উত্তর রিপোর্টে খোঁজা হতে পারে। পাশাপাশি ভবনটির ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে সেখানে কোনও ধরনের ক্ষতি বা ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল কি না, সেটিও বিবেচনায় আসতে পারে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষা, গবেষণা ও ছাত্ররাজনীতির পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিতর্কের কেন্দ্র। তাই ক্যাম্পাসে ধর্মীয় অনুষ্ঠান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠায় বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই বৃহত্তর আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত ধর্মীয় আচরণের স্বাধীনতার প্রশ্ন, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরপেক্ষ পরিবেশ, প্রশাসনিক অনুমতি এবং নিরাপত্তার বিধি, এই দুই দিকের মধ্যে ভারসাম্য রাখার দায়িত্ব প্রশাসনের। এখন রিপোর্টে কী তথ্য উঠে আসে এবং তার ভিত্তিতে উপাচার্য বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কী সিদ্ধান্ত নেন, সেদিকেই নজর রয়েছে।
তবে এখনও পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে যজ্ঞের আয়োজনকে কেন্দ্র করে কোনও চূড়ান্ত শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত তথ্য নেই। তাই বিভিন্ন পক্ষের অভিযোগ, মন্তব্য বা রাজনৈতিক ব্যাখ্যাকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। রিপোর্ট হাতে আসার পরই প্রশাসনের অবস্থান আরও পরিষ্কার হবে।
যদি রিপোর্টে অনুমতি ছাড়া অনুষ্ঠান আয়োজন বা নিরাপত্তাবিধি ভঙ্গের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে পারে। আবার প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়া হয়ে থাকলে, বিতর্কের প্রকৃত কারণও স্পষ্ট হবে। ফলে উপাচার্যের চাওয়া রিপোর্ট এখন এই ঘটনার পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

