নেতাজি মন্তব্যে ক্ষমা চাইলেন অনন্ত মহারাজ, বঙ্গবিভূষণ প্রত্যাহারের পর বদলাল সুর
বঙ্গবিভূষণ প্রত্যাহারের পরই ক্ষমা, নেতাজি মন্তব্যে অনন্ত মহারাজের নতুন বার্তা
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের মধ্যেই অবশেষে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইলেন বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ তথা গ্রেটার কোচবিহারপন্থী নেতা অনন্ত মহারাজ, অর্থাৎ নগেন্দ্র রায়। শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, তাঁর বক্তব্যে কেউ মানসিকভাবে আঘাত পেয়ে থাকলে তিনি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। একইসঙ্গে নেতাজির প্রতি শ্রদ্ধাও জানান তিনি। তাঁর এই ক্ষমাপ্রার্থণা এসেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার বঙ্গবিভূষণ সম্মান প্রত্যাহার করার একদিন পরেই।
ঘটনার সূত্রপাত নেতাজি এবং আজাদ হিন্দ ফৌজ (INA) নিয়ে অনন্ত মহারাজের একাধিক মন্তব্যকে ঘিরে। প্রকাশ্যে আসা বক্তব্যে তিনি নেতাজির স্বাধীনতা সংগ্রামে ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এমনকি আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠনে নেতাজির নিজস্ব সক্ষমতা নিয়েও বিতর্কিত মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্যের আরও কিছু অংশে নেতাজির ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। এরপরই রাজ্যজুড়ে শুরু হয় তীব্র প্রতিক্রিয়া।
নেতাজি বাঙালির আবেগ ও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হওয়ায় বিষয়টি দ্রুত রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অনন্ত মহারাজের মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন এবং জাতীয় নেতাদের অবমাননা বরদাস্ত করা হবে না বলে জানান। আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও সামনে আসে। একইসঙ্গে বিতর্কিত বক্তব্য সরিয়ে নেওয়া এবং ক্ষমা চাওয়ার দাবিও ওঠে।
এরপর ১৩ আগস্ট বড় সিদ্ধান্ত নেয় রাজ্য সরকার। অনন্ত মহারাজকে দেওয়া বঙ্গবিভূষণ সম্মান প্রত্যাহার করা হয়। এই সম্মান তাঁকে ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত থেকে দেওয়া হয়েছিল। সে সময়ও বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদকে বঙ্গবিভূষণ দেওয়াকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হয়েছিল।
রাজ্য সরকারের বক্তব্য, নেতাজির মতো জাতীয় ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে অনন্ত মহারাজের মন্তব্য বঙ্গবিভূষণের মতো সম্মানের মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সেই কারণেই পুরস্কার প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সম্মান প্রত্যাহারের পরদিনই অনন্ত মহারাজের সুর বদলাতে দেখা যায়। ভিডিও বার্তায় তিনি মূলত তাঁর বক্তব্যে কেউ আহত হয়ে থাকলে তার জন্য দুঃখপ্রকাশ করেন এবং নেতাজির প্রতি সম্মান জানান। তবে তিনি নিজের আগের বক্তব্যের ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা নিয়ে বিস্তারিত কোনও নতুন অবস্থান জানাননি। ফলে তাঁর ক্ষমাপ্রার্থণা বিতর্ক কতটা প্রশমিত করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
এর মধ্যেই তাঁর মন্তব্য ঘিরে আইনি প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। কোচবিহারে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে এফআইআর দায়ের হওয়ার খবর সামনে এসেছে। ফলে শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, প্রশাসনিক ও আইনগত পদক্ষেপের দিকেও এখন নজর রয়েছে।
অন্যদিকে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য নেতাজির প্রতি দলের শ্রদ্ধার কথা স্পষ্ট করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, নেতাজিকে ঘিরে মানুষের আবেগকে দল গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। ফলে অনন্ত মহারাজের মন্তব্য থেকে দলের অবস্থান আলাদা রাখার চেষ্টা বিজেপির তরফেও স্পষ্ট হয়েছে।
সব মিলিয়ে, বঙ্গবিভূষণ প্রত্যাহারের পর অনন্ত মহারাজের প্রকাশ্য ক্ষমাপ্রার্থণা এই বিতর্কে নতুন মোড় এনেছে। তবে ক্ষমা চাওয়ার ফলে তাঁর বিরুদ্ধে চলা অভিযোগ বা আইনি প্রক্রিয়ায় কী প্রভাব পড়বে, তা এখনই স্পষ্ট নয়। আগামী দিনে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবং প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই নজর থাকবে।

