18 August Independence Day in Bengal: কেন নদিয়া, মালদায় ১৮ আগস্ট স্বাধীনতা দিবস পালন হয়

NEWS INDIA বাংলা
0

১৫ আগস্ট নয়, স্বাধীনতার আনন্দ ১৮ আগস্ট! বাংলার এই এলাকাগুলির ইতিহাস কেন আলাদা?

স্বাধীনতার তিন দিন পর উঠেছিল তেরঙ্গা, বাংলার কিছু এলাকায় ১৮ আগস্টের এই ইতিহাস আজও অমলিন 

১৮ আগস্ট স্বাধীনতা দিবস স্মরণে বাংলার সীমান্তবর্তী এলাকার জাতীয় পতাকা উত্তোলন


১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের অধিকাংশ জায়গায় শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার উৎসব। দিল্লি থেকে কলকাতা, সর্বত্রই উড়েছিল তেরঙ্গা। কিন্তু বাংলার ইতিহাসে এমন কিছু এলাকা রয়েছে, যেখানে স্বাধীনতার আনন্দ পৌঁছেছিল কয়েক দিন পরে। নদিয়া, মালদা এবং মুর্শিদাবাদের কিছু অংশে তাই ১৮ আগস্ট আজও বিশেষ স্মৃতির দিন। কারণ, ১৯৪৭-এর ১৫ আগস্টেও সেখানকার মানুষ নিশ্চিত ছিলেন না, তাঁদের এলাকা শেষ পর্যন্ত ভারত, না কি পাকিস্তানের অংশ হবে।

দেশভাগের সময় ভারত ও পাকিস্তানের সীমানা নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ব্রিটিশ আইনজীবী স্যার সিরিল র‍্যাডক্লিফের নেতৃত্বাধীন Bengal Boundary Commission-কে। জনসংখ্যার বিন্যাস, প্রশাসনিক সীমানা এবং ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে তৈরি হয় নতুন সীমারেখা। সেই সিদ্ধান্ত সরকারি ভাবে প্রকাশিত হয় ১৭ আগস্ট ১৯৪৭। সরকারি গেজেটেও ওই তারিখে Bengal Boundary Commission-এর রিপোর্ট প্রকাশের উল্লেখ রয়েছে।

কিন্তু তার আগে থেকেই তৈরি হয়েছিল প্রবল অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে নদিয়ার বিস্তীর্ণ অংশকে প্রাথমিকভাবে পূর্ববঙ্গ বা East Pakistan-এর দিকে যাওয়ার কথা জানা গেলে স্থানীয় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, প্রতিবাদের পর সীমান্তরেখা নিয়ে সংশোধন করা হয়। কৃষ্ণনগর, রানাঘাট-সহ নদিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ শেষ পর্যন্ত ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৭ আগস্ট রাতে সংশোধিত সিদ্ধান্তের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ১৮ আগস্ট বহু এলাকায় তেরঙ্গা ওঠে।

মালদার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ১৫ আগস্টের সময় জেলার একটি বড় অংশকে পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল। সেই সময় কিছু জায়গায় পাকিস্তানের পতাকাও উত্তোলন করা হয় বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উঠে এসেছে। পরে সীমান্ত পুনর্বিন্যাসের সিদ্ধান্তে মালদার একাধিক অংশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ১৮ আগস্ট সেখানে ভারতীয় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়।

মুর্শিদাবাদ নিয়েও একই ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ১৫ আগস্টের আগে ও পরে জেলার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল এবং কিছু সরকারি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পাকিস্তানের পতাকা ওঠার ঘটনাও ঘটেছিল। পরে সীমান্ত সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত স্পষ্ট হলে মুর্শিদাবাদ ভারতের অংশ হিসেবে নিশ্চিত হয়। তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, মুর্শিদাবাদ শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ জেলা হিসেবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, তাই নদিয়া বা মালদার সঙ্গে এর সীমান্ত-পরিবর্তনের ইতিহাস একেবারে অভিন্ন ছিল না।

এই ইতিহাসের অন্যতম পরিচিত স্মারক নদিয়ার শিবনিবাস। সেখানে ১৮ আগস্টকে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালনের ঐতিহ্য তৈরি হয়েছে। ১৭ আগস্ট রাতে সীমান্তের সংশোধিত সিদ্ধান্তের খবর প্রকাশ্যে আসার পর পরদিন স্থানীয় বাসিন্দারা ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। পরবর্তী সময়ে এই ঘটনাকে স্মরণ করে ১৮ আগস্টের বিশেষ উদযাপন চালু হয়।

তবে ১৮ আগস্ট ভারতের সরকারি স্বাধীনতা দিবস নয়। এটি মূলত কিছু সীমান্তবর্তী এলাকার স্থানীয় ঐতিহাসিক স্মৃতি ও উদযাপনের দিন। সরকারি ভাবে ভারতের স্বাধীনতা দিবস ১৫ আগস্টই পালিত হয়। কিন্তু দেশভাগের সময় সীমান্ত নির্ধারণ নিয়ে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল, তার বাস্তব অভিঘাত বোঝার ক্ষেত্রে ১৮ আগস্টের এই স্মৃতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ, স্বাধীনতা শুধু একটি রাজনৈতিক ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৪৭ সালে সীমান্তের একটি রেখা বদলে দিয়েছিল বহু মানুষের পরিচয়, প্রশাসনিক অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ। কারও কাছে ১৫ আগস্ট ছিল স্বাধীনতার দিন, আবার কারও কাছে স্বাধীন ভারতের অংশ হওয়ার নিশ্চিত খবর এসেছিল আরও পরে।

তাই ১৮ আগস্টের স্মৃতি বাংলার দেশভাগের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি মনে করিয়ে দেয়, ১৯৪৭-এর স্বাধীনতা যেমন ছিল আনন্দের, তেমনই সীমান্তবর্তী মানুষের কাছে তা ছিল অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ এবং অপেক্ষার সময়। সেই ইতিহাসের স্মারক হিসেবেই আজও নদিয়া, মালদা ও আশপাশের কিছু এলাকায় ১৮ আগস্ট বিশেষ মর্যাদায় পালিত হয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!