মা কালীর বুকে দাঁড়িয়ে মহাদেব! মধ্যমগ্রামের মহাকাল মন্দিরের ‘উলটপুরাণ’ ঘিরে চমকপ্রদ লোককথা
যেখানে কালীর পায়ের নীচে নন শিব, বুকের উপর দাঁড়িয়ে মহাদেব! মধ্যমগ্রামের এই মন্দিরের কাহিনি জানেন?
বাংলার মন্দির-সংস্কৃতিতে বৈচিত্র্যের কোনও শেষ নেই। দেবদেবীর আরাধনা, মন্দিরের ইতিহাস এবং লোকবিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নানা আশ্চর্য কাহিনি। তেমনই এক ব্যতিক্রমী মন্দির রয়েছে উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামে, যেখানে প্রচলিত কালীমূর্তির চেনা রূপ একেবারেই বদলে গিয়েছে। এখানে মা কালীর পায়ের নীচে মহাদেব নন, বরং দেবী কালীর বুকের উপর পা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছেন স্বয়ং মহাকাল বা শিব।
মধ্যমগ্রাম চৌমাথা থেকে বাদু রোড ধরে কয়েক মিনিট এগোলেই দেখা মেলে এই মন্দিরের। স্থানীয়ভাবে এটি মহাকাল মন্দির নামে পরিচিত। মন্দিরের বিশেষ মূর্তি দেখতে দূরদূরান্ত থেকে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা আসেন বলে স্থানীয়দের দাবি। প্রচলিত কালীমূর্তির সঙ্গে সম্পূর্ণ বিপরীত এই প্রতিমাই মন্দিরটির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
সাধারণ কালীমূর্তিতে দেখা যায়, দেবী কালীর পায়ের নীচে শায়িত রয়েছেন মহাদেব। হিন্দু ধর্মীয় প্রতীকী ব্যাখ্যায় এই রূপের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শক্তি ও চেতনার বিশেষ ধারণা। কিন্তু মধ্যমগ্রামের এই মন্দিরে সেই পরিচিত বিন্যাসই যেন উল্টে দেওয়া হয়েছে। এখানে শিব দাঁড়িয়ে রয়েছেন দেবীর বুকের উপর, আর দেবী রয়েছেন তাঁর পায়ের নীচে।
কীভাবে এমন ব্যতিক্রমী মূর্তির প্রতিষ্ঠা হল, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে একটি লোককথা। কথিত আছে, বহু বছর আগে মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতার বাড়িতে এক ঝড়ের রাতে উড়ে এসে পড়েছিল একটি অজানা ক্যালেন্ডার। সেই ক্যালেন্ডারে ছাপা ছিল এই বিশেষ মূর্তির ছবি। ক্যালেন্ডারটি কোথা থেকে এসেছিল, তা নিয়ে নিশ্চিত কোনও তথ্য পাওয়া যায় না। এরপর মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতার স্বপ্নে দেবী কালীর আবির্ভাব ঘটে এবং এই বিশেষ রূপেই তাঁকে প্রতিষ্ঠা করে পুজো করার নির্দেশ দেন বলে লোকমুখে প্রচলিত।
সেই বিশ্বাস থেকেই নাকি প্রতিষ্ঠিত হয় এই ব্যতিক্রমী দেবীমূর্তি। তবে এই কাহিনির ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে নির্ভরযোগ্য নথি পাওয়া যায় কি না, তা আলাদা বিষয়। মূলত স্থানীয় লোকবিশ্বাস এবং ভক্তদের মুখে মুখে প্রচলিত গল্পই মন্দিরটির বিশেষ পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে।
এই মূর্তির প্রতীকী ব্যাখ্যাও স্থানীয়ভাবে ভিন্নভাবে করা হয়। প্রচলিত কালীমূর্তিতে যেখানে শিবের উপর দেবীর অবস্থানকে শক্তির উন্মেষ ও সংযমের সঙ্গে ব্যাখ্যা করা হয়, সেখানে এই মন্দিরে শিবের অবস্থানকে মহাকাল বা পুরুষ শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। দেবী ও শিবের এই বিপরীত বিন্যাসকে কেউ প্রকৃতি ও পুরুষের সম্পর্কের প্রতীক হিসেবেও ব্যাখ্যা করেন।
তবে এই মন্দিরকে ঘিরে ‘বিশ্বের একমাত্র’ বা ‘অলৌকিক’ মূর্তি হিসেবে যে দাবি স্থানীয়ভাবে প্রচলিত, তার স্বাধীন ঐতিহাসিক বা বৈজ্ঞানিক যাচাই আলাদা করে প্রয়োজন। তাই এই মন্দিরের কাহিনি মূলত লোকবিশ্বাস, ধর্মীয় আস্থা এবং স্থানীয় সংস্কৃতির দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা যায়।
মধ্যমগ্রামের মহাকাল মন্দির তাই শুধু একটি ধর্মীয় স্থান নয়, স্থানীয় বিশ্বাস ও বাংলার বৈচিত্র্যময় মন্দির-সংস্কৃতিরও একটি আকর্ষণীয় উদাহরণ। চেনা দেবীমূর্তির সম্পূর্ণ বিপরীত বিন্যাসই এই মন্দিরকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। আর সেই কারণেই কৌতূহলী দর্শনার্থীদের কাছে জায়গাটি আজও বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র।

