অযোধ্যার রাম মন্দিরকে ঘিরে বহুচর্চিত অনুদান তছরুপ ও চুরি মামলার তদন্তে প্রতিদিনই সামনে আসছে নতুন নতুন তথ্য। প্রথমে অভিযোগ ছিল মন্দিরে জমা পড়া নগদ অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রীর হিসাব নিয়ে। কিন্তু তদন্ত যত গভীরে যাচ্ছে, ততই প্রশ্ন উঠছে—এই আর্থিক অনিয়ম কি শুধুমাত্র মন্দিরের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল, নাকি পুরো অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থার মধ্যেই কোথাও বড় ধরনের গাফিলতি বা কারসাজি লুকিয়ে রয়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এবার তদন্তকারীদের নজর পড়েছে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার ওপর। উত্তরপ্রদেশ সরকারের গঠিত বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) ইতিমধ্যেই রাম মন্দির ট্রাস্টের আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি চেয়ে ব্যাঙ্ক অফ বরোদার অযোধ্যা শাখাকে নোটিস পাঠিয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রের খবর। তদন্তকারীরা জানতে চাইছেন, অনলাইনে পাওয়া অনুদান কীভাবে জমা হতো, সেই অর্থ কোথায় কোথায় স্থানান্তরিত হয়েছে এবং লেনদেনের প্রতিটি ধাপ কতটা স্বচ্ছ ছিল।
অনুদানের টাকা কোথায় গেল?
সূত্রের দাবি, মন্দিরে ভক্তদের অনলাইন অনুদানের প্রায় পুরোটাই ব্যাঙ্ক অফ বরোদার অযোধ্যা শাখায় থাকা ট্রাস্টের অ্যাকাউন্টে জমা পড়ত। কিন্তু সেই জমার পরিমাণ নিয়ে তদন্তকারীদের একাংশের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ দিনে ওই অ্যাকাউন্টে প্রায় ১ থেকে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত জমা পড়ত। বিশেষ উৎসব বা ভিড়ের দিনে সেই অঙ্ক বেড়ে ৪ থেকে ৫ কোটি টাকায় পৌঁছাত। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ওই অ্যাকাউন্টে মোট প্রায় ৩২৭ কোটি টাকা জমা পড়েছে বলে জানা গিয়েছে। তবে এই অঙ্কের একটি বড় অংশই সুদের মাধ্যমে এসেছে বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।
তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন, ট্রাস্টের হিসাবপত্র, অনুদানের প্রকৃত পরিমাণ এবং ব্যাঙ্কে জমা হওয়া অর্থের মধ্যে কোনও অসঙ্গতি রয়েছে কি না।
ট্রাস্ট-ঘনিষ্ঠদের অ্যাকাউন্টও তদন্তের আওতায়
তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে ট্রাস্টের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট। প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, ট্রাস্টের কয়েকজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি এবং অনুদানের হিসাব-নিকাশের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের অ্যাকাউন্টও এখন পর্যবেক্ষণে রয়েছে।
এর মধ্যে ট্রাস্টের শীর্ষ পদাধিকারী চম্পত রায়ের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টও রয়েছে। জানা গিয়েছে, তাঁর অ্যাকাউন্টটি আগে দিল্লিতে থাকলেও পরে অযোধ্যা শাখায় স্থানান্তর করা হয়েছিল। তদন্তকারী সূত্রের দাবি, ওই অ্যাকাউন্টে আপাতত উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থের লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়নি।
তবে তদন্তের সময় চম্পত রায়ের এক চালকের অ্যাকাউন্টে কিছু অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেনের তথ্য উঠে এসেছে বলে সূত্রের দাবি। ওই চালক ইতিমধ্যেই চুরির অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন। সেই লেনদেনগুলির সঙ্গে মন্দিরের অনুদানের কোনও যোগ রয়েছে কি না, তা এখন খতিয়ে দেখছে এসআইটি।
কয়েক হাজার কোটি টাকার অনুদান নিয়ে প্রশ্ন
তদন্তে উঠে আসা তথ্য আরও বিস্ময় তৈরি করেছে। সূত্রের দাবি, গত কয়েক বছরে রাম মন্দিরে নগদ অনুদান হিসেবে প্রায় ৩,৫০০ কোটিরও বেশি টাকা জমা পড়েছে। পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ সোনা, রুপোর অলঙ্কার এবং অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রীও ভক্তরা দান করেছেন।
কিন্তু এই বিপুল সম্পদের একটি অংশের নির্ভুল হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না বলেই তদন্তকারী সংস্থার সন্দেহ। শুধু নগদ অর্থ নয়, দান হিসেবে পাওয়া বেশ কিছু মূল্যবান সামগ্রীরও খোঁজ মিলছে না বলে জানা গিয়েছে। এমনকি রুপোর তৈরি কিছু বিশেষ ধর্মীয় সামগ্রীও নিখোঁজ রয়েছে বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, এত বড় পরিমাণ সম্পদ কীভাবে অদৃশ্য হয়ে গেল এবং দীর্ঘদিন ধরে সেই অনিয়ম কারও নজরে এল না কেন?
অভিযোগ দায়েরে দেরি কেন?
তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, অনুদান সংক্রান্ত অনিয়মের বিষয়ে মন্দিরের একাধিক দায়িত্বশীল ব্যক্তি আগে থেকেই অবগত ছিলেন কি না।
সূত্রের দাবি, এসআইটির হাতে থাকা কিছু নথি ও বয়ানে এমন ইঙ্গিত মিলেছে যে, অনুদানের হিসাব নিয়ে অসঙ্গতির বিষয়টি কয়েকজন শীর্ষ কর্তৃপক্ষের অজানা ছিল না। কিন্তু সেই সময় পুলিশের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয়নি।
এই বিষয়টি এখন তদন্তের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। তদন্তকারীরা জানতে চাইছেন, অভিযোগ দায়েরে এত দেরি হওয়ার কারণ কী ছিল? বিষয়টি কি প্রশাসনিক গাফিলতি, নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য গোপন রাখার চেষ্টা হয়েছিল?
ব্যাঙ্কের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে
তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, অনুদান গণনার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের পরিবর্তনের বিষয়ে ব্যাঙ্কের তরফে একসময় প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই পরিবর্তন কার্যকর হয়নি বলে সূত্রের খবর।
এই তথ্য সামনে আসার পর তদন্তকারীরা ব্যাঙ্কের ভূমিকা নিয়েও বিস্তারিত খোঁজখবর শুরু করেছেন। ব্যাঙ্ক কেবলমাত্র লেনদেনের মাধ্যম ছিল, নাকি কোনও পর্যায়ে নজরদারির ঘাটতি ছিল—সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে।
তবে এখনও পর্যন্ত কোনও ব্যাঙ্ক আধিকারিকের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়নি। তদন্তকারীরা শুধুমাত্র সমস্ত আর্থিক তথ্য, অ্যাকাউন্ট স্টেটমেন্ট এবং লেনদেনের রেকর্ড বিশ্লেষণ করছেন।
তদন্তের পরবর্তী ধাপ কী?
এসআইটির লক্ষ্য এখন পুরো অর্থ প্রবাহের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরি করা। অনুদান সংগ্রহ থেকে শুরু করে ব্যাঙ্কে জমা, সেখান থেকে অর্থের ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা—প্রতিটি ধাপ আলাদা করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রয়োজনে আরও কয়েকজন ট্রাস্ট সদস্য, কর্মী এবং ব্যাঙ্কের দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে বলেও সূত্রের খবর।
এই মামলার তদন্ত এখনও চলছে। ফলে শেষ পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে কী অভিযোগ প্রমাণিত হবে, আদৌ কোনও বড় আর্থিক দুর্নীতির প্রমাণ মিলবে কি না, নাকি সব অভিযোগের অন্য ব্যাখ্যা সামনে আসবে—সেই উত্তর মিলবে তদন্ত সম্পূর্ণ হওয়ার পরই।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, অযোধ্যার রাম মন্দিরের অনুদান সংক্রান্ত এই তদন্ত এখন শুধু চুরির অভিযোগেই সীমাবদ্ধ নেই। আর্থিক লেনদেন, হিসাবরক্ষণ, প্রশাসনিক নজরদারি এবং ব্যাঙ্কিং প্রক্রিয়া—সবকিছুকেই একসঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই নতুন নতুন প্রশ্ন সামনে আসছে। এখন নজর তদন্তকারীদের চূড়ান্ত রিপোর্টের দিকে, কারণ সেই রিপোর্টই ঠিক করে দেবে এই বহুচর্চিত মামলার প্রকৃত চিত্র কতটা গভীর।

