‘অপারেশন সিন্দুর’কে কেন্দ্র করে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে জাতীয় রাজনীতি। জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগামে জঙ্গি হামলার পর ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর পাল্টা অভিযানের সময় ঠিক কী ঘটেছিল, সেই প্রশ্নকে ঘিরেই এবার সরাসরি সংসদে সংঘাত শুরু হয়েছে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে। কংগ্রেসের অভিযোগ, লোকসভায় দাঁড়িয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং এমন একটি তথ্য তুলে ধরেছিলেন, যা পরবর্তী সরকারি তথ্যের সঙ্গে মিলছে না। সেই কারণেই তাঁর বিরুদ্ধে স্বাধিকার ভঙ্গের (Privilege Motion) নোটিস জমা দেওয়া হয়েছে।
এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—‘অপারেশন সিন্দুর’-এর সময় ভারতীয় বাহিনীর কোনও জওয়ান শহিদ হয়েছিলেন কি না। প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য এবং পরবর্তী সরকারি তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে বলেই দাবি করছে বিরোধী শিবির।
লোকসভার স্পিকারের কাছে কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ
কংগ্রেস নেতা এবং পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির (PAC) চেয়ারম্যান কে. সি. বেণুগোপাল লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে লিখিতভাবে স্বাধিকার ভঙ্গের নোটিস জমা দিয়েছেন। লোকসভার কার্যবিধির ২২৩ নম্বর ধারার উল্লেখ করে তিনি দাবি করেছেন, সংসদে মন্ত্রীদের দেওয়া তথ্য নির্ভুল হওয়া অত্যন্ত জরুরি। যদি কোনও মন্ত্রী ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য দেন বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেন, তাহলে তা সংসদের মর্যাদা ও সদস্যদের অধিকার—উভয়েরই লঙ্ঘন।
বেণুগোপালের অভিযোগ, গত বছরের ২৮ জুলাই লোকসভায় পহেলগাম হামলা এবং তার জবাবে পরিচালিত ‘অপারেশন সিন্দুর’ নিয়ে আলোচনার সময় প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানিয়েছিলেন, অভিযানে ভারতীয় বাহিনীর কোনও ক্ষতি হয়নি এবং কোনও জওয়ান শহিদ হননি। কিন্তু সম্প্রতি সরকারি সূত্রেই জানানো হয়েছে, ওই অভিযানের সময় মোট ছয়জন সেনা সদস্য দেশের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন।
কংগ্রেসের মতে, এই দুই তথ্যের মধ্যে স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে এবং তার ব্যাখ্যা দেওয়া সরকারের দায়িত্ব।
কেন এত গুরুত্ব পাচ্ছে এই বিতর্ক?
সংসদে দেওয়া প্রতিটি সরকারি বক্তব্য সরকারি নথির অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে সেখানে দেওয়া তথ্য পরবর্তীকালে সরকারি নথি বা বিবৃতির সঙ্গে না মিললে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে।
বেণুগোপাল তাঁর অভিযোগপত্রে লিখেছেন, যদি কোনও মন্ত্রী সংসদে অসম্পূর্ণ বা বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করেন, তাহলে তা শুধু বিরোধীদের নয়, গোটা সংসদকেই বিভ্রান্ত করার শামিল। তাঁর দাবি, বিষয়টি শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, সংসদীয় জবাবদিহিতার সঙ্গেও জড়িত।
এক্স-এ সরকারের বিরুদ্ধে সরব কংগ্রেস
সংসদে অভিযোগ জানানোর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও কেন্দ্রীয় সরকারকে আক্রমণ করেছেন কংগ্রেস নেতা।
তাঁর বক্তব্য, দেশের জন্য আত্মবলিদান দেওয়া সেনা সদস্যদের প্রকৃত তথ্য দেশের সামনে তুলে ধরা উচিত ছিল। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, যদি পরে সরকার নিজেই ছয়জন শহিদের কথা স্বীকার করে, তাহলে সংসদে আগের বক্তব্যের সঙ্গে সেই তথ্যের অমিল কেন?
কংগ্রেসের দাবি, শহিদদের আত্মত্যাগকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়ার পাশাপাশি সংসদে দেওয়া প্রতিটি সরকারি বক্তব্যেরও নির্ভুলতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
জাতীয় যুদ্ধ স্মারকে যুক্ত হল ছয় বীর শহিদের নাম
সম্প্রতি দিল্লির ন্যাশনাল ওয়ার মেমোরিয়ালে ‘অপারেশন সিন্দুর’-এ প্রাণ উৎসর্গ করা ছয়জন বীর সেনা সদস্যের নাম সংযোজন করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন ভারতীয় সেনাবাহিনীর এবং একজন ভারতীয় বিমানবাহিনীর সদস্য।
এই নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর থেকেই নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে—যদি অভিযানে কোনও ক্ষয়ক্ষতি না হয়ে থাকে, তাহলে এই ছয়জন শহিদের নাম সরকারি স্মারকে যুক্ত করা হল কীভাবে?
এই ঘটনাই কংগ্রেসের অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের ব্যাখ্যা
বিতর্ক বাড়তেই প্রতিরক্ষা মন্ত্রক বিষয়টি নিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে।
মন্ত্রকের দাবি, সামাজিক মাধ্যমে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের একটি অংশ কেটে আলাদা করে ছড়ানো হচ্ছে, যার ফলে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। পুরো বক্তব্যের প্রেক্ষাপট বিবেচনা না করেই ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার কখনওই শহিদ সেনা সদস্যদের আত্মত্যাগ অস্বীকার করেনি। বরং প্রথম সুযোগেই তাঁদের নাম জাতীয় যুদ্ধ স্মারকে যুক্ত করে সম্মান জানানো হয়েছে।
মন্ত্রকের আরও দাবি, কিছু পোস্টে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এমন ধারণা তৈরি করা হচ্ছে যে প্রতিরক্ষামন্ত্রী সেনা সদস্যদের মৃত্যুর বিষয়টি অস্বীকার করেছিলেন। তাদের মতে, এই ব্যাখ্যা বাস্তব তথ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
কী ছিল ‘অপারেশন সিন্দুর’?
২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগামে পর্যটকদের ওপর ভয়াবহ জঙ্গি হামলায় ২৬ জন সাধারণ নাগরিক নিহত হন। এই হামলার জন্য পাকিস্তান-সমর্থিত জঙ্গি সংগঠনগুলিকে দায়ী করে ভারত।
এরপর ভারতীয় সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনী যৌথভাবে সীমান্তের ওপারে জঙ্গি ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে সামরিক অভিযান চালায়। এই অভিযানের নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন সিন্দুর’।
সরকারের দাবি ছিল, অভিযানে একাধিক জঙ্গি ঘাঁটি ধ্বংস করা হয়েছে এবং সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামোর বড়সড় ক্ষতি হয়েছে। তবে সামরিক অভিযানের বিস্তারিত তথ্য নিরাপত্তার স্বার্থে প্রকাশ করা হয়নি।
এখন কী হতে পারে?
স্বাধিকার ভঙ্গের নোটিস জমা পড়লেই যে তদন্ত বা ব্যবস্থা শুরু হবে, এমন নয়। প্রথমে লোকসভার স্পিকার অভিযোগটি খতিয়ে দেখবেন। তিনি মনে করলে বিষয়টি স্বাধিকার কমিটির কাছে পাঠাতে পারেন। আবার প্রাথমিক পর্যায়েই অভিযোগ খারিজও করে দিতে পারেন।
ফলে এখন নজর স্পিকারের সিদ্ধান্তের দিকে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক মহলেও এই বিতর্ক আগামী দিনে আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
রাজনৈতিক সংঘাতের পাশাপাশি জবাবদিহিতার প্রশ্ন
‘অপারেশন সিন্দুর’ দেশের নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের অবস্থানের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু সেই অভিযানের তথ্য ঘিরে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে নতুন সংঘাত তৈরি হওয়ায় বিষয়টি এখন শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিসরেই সীমাবদ্ধ নেই।
একদিকে কংগ্রেসের দাবি, সংসদে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে সরকারি নথির অমিল থাকলে তার জবাব সরকারকে দিতেই হবে। অন্যদিকে কেন্দ্রের বক্তব্য, প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মন্তব্যকে আংশিকভাবে তুলে ধরে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।
চূড়ান্ত সত্য কী, সংসদে দেওয়া বক্তব্যের ব্যাখ্যা কীভাবে করা হবে এবং এই বিতর্ক আদৌ স্বাধিকার কমিটি পর্যন্ত পৌঁছাবে কি না—সেই উত্তর মিলবে আগামী দিনে। তবে আপাতত নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ‘অপারেশন সিন্দুর’কে ঘিরে রাজনৈতিক লড়াই এখনও থামার কোনও লক্ষণ নেই।

