ইথানল মিশ্রিত পেট্রল কতটা নিরাপদ? সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্রের বক্তব্যে নতুন প্রশ্ন

NEWS INDIA বাংলা
0
E20 ethanol blended petrol fuel pump car engine India news


ভারতে জ্বালানির আমদানি কমানো এবং পরিবেশবান্ধব বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে পেট্রলের সঙ্গে ইথানল মিশিয়ে সরবরাহ করছে কেন্দ্রীয় সরকার। তবে এই নীতি নিয়ে সাধারণ মানুষের একাংশের মধ্যে যেমন আগ্রহ রয়েছে, তেমনই রয়েছে একাধিক প্রশ্নও। ইথানল মিশ্রিত পেট্রল দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে গাড়ির ইঞ্জিনের ওপর কী প্রভাব পড়বে? মাইলেজ কমবে কি? পুরনো গাড়ির ক্ষেত্রে কোনও সমস্যা তৈরি হতে পারে কি না—এই সব বিষয় নিয়েই বিতর্ক চলছে।


এই আবহেই সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলার শুনানিতে কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কেন্দ্র আদালতকে জানিয়েছে, বর্তমানে যে ইথানল মিশ্রণ নীতি কার্যকর করা হচ্ছে, তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনও মূল্যায়নের পর্যায়ে রয়েছে। অর্থাৎ, এই প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল জানতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।



কেন ইথানলের ওপর এত জোর দিচ্ছে কেন্দ্র?


ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অপরিশোধিত তেল আমদানিকারী দেশ। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের ওঠানামার প্রভাব সরাসরি দেশের অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের পকেটে পড়ে। সেই নির্ভরতা কমাতেই বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ইথানলের ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে কেন্দ্র।


ইথানল মূলত আখ, ভুট্টা, ধানসহ বিভিন্ন কৃষিজ ফসল এবং জৈব উপাদান থেকে তৈরি এক ধরনের বায়ো-ফুয়েল। এটি পেট্রলের সঙ্গে নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশিয়ে ব্যবহার করা হয়। সরকারের দাবি, এর ফলে বিদেশ থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রয়োজন কমবে, কৃষকরাও অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ পাবেন এবং কার্বন নিঃসরণও হ্রাস পাবে।


বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বজুড়ে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে ঝোঁক বাড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও এই নীতিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।




সুপ্রিম কোর্টে কী বলল কেন্দ্র?



ইথানল মিশ্রিত পেট্রল নিয়ে চলা একটি মামলার শুনানিতে কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে, বর্তমানে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ইথানল মিশ্রণের যে কর্মসূচি চলছে, তা এখনও মূল্যায়নের পর্যায়ে রয়েছে। এই প্রকল্পের প্রকৃত প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে আরও প্রায় এক বছর সময় লাগতে পারে।


শুনানির সময় কেন্দ্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রকল্পটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে এবং এর দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। অর্থাৎ, সরকার নিজেও এই নীতির বিভিন্ন দিক নিয়ে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।



কেন উঠছে প্রশ্ন?



দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কিছু গাড়িচালক দাবি করেছেন, ইথানল মিশ্রিত পেট্রল ব্যবহারের পর তাঁদের গাড়ির মাইলেজ কমেছে বা ইঞ্জিনের কর্মক্ষমতায় পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে পুরনো মডেলের গাড়ির ক্ষেত্রে এমন অভিযোগ বেশি শোনা যাচ্ছে।


তবে এই অভিযোগগুলির পক্ষে এখনও কোনও সর্বসম্মত বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসেনি। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, কোনও গাড়ি কতটা ইথানল-সমৃদ্ধ জ্বালানি ব্যবহার করতে পারবে, তা নির্ভর করে সেই গাড়ির ইঞ্জিনের নকশা এবং প্রস্তুতকারকের প্রযুক্তিগত মানের উপর।


বর্তমানে বাজারে আসা বহু নতুন গাড়ি ইতিমধ্যেই নির্দিষ্ট মাত্রার ইথানল মিশ্রিত জ্বালানির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি হচ্ছে। তবে বহু পুরনো মডেলের ক্ষেত্রে প্রস্তুতকারকের নির্দেশিকা মেনে চলাই সবচেয়ে নিরাপদ।




কী কী সুবিধার কথা বলছে সরকার?



সরকারের মতে, ইথানল মিশ্রণের ফলে একাধিক ইতিবাচক দিক রয়েছে।


প্রথমত, অপরিশোধিত তেল আমদানির উপর নির্ভরতা কমবে, যার ফলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। দ্বিতীয়ত, আখ, ভুট্টা এবং অন্যান্য কৃষিজ পণ্যের চাহিদা বাড়ায় কৃষকেরা অতিরিক্ত বাজার পাবেন। তৃতীয়ত, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমলে পরিবেশ দূষণ এবং কার্বন নিঃসরণও কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।


এই কারণেই আগামী দিনে ইথানলের ব্যবহার আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে কেন্দ্র আগেই ইঙ্গিত দিয়েছে।


ভবিষ্যতে কি আরও বাড়বে ইথানলের পরিমাণ?

কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিগত লক্ষ্য ধাপে ধাপে ইথানলের ব্যবহার বৃদ্ধি করা। বিভিন্ন সরকারি বক্তব্যে ভবিষ্যতে আরও বেশি শতাংশ ইথানল মিশ্রণের সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে। তবে সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার আগে বর্তমান কর্মসূচির ফলাফল, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং যানবাহনের উপযোগিতা খতিয়ে দেখা হবে বলেই ইঙ্গিত মিলেছে।


বিশেষজ্ঞদের মতে, বিকল্প জ্বালানির দিকে এগোনো সময়ের দাবি হলেও সেই পরিবর্তন এমনভাবে বাস্তবায়িত হওয়া প্রয়োজন, যাতে সাধারণ গ্রাহক বা যানবাহনের মালিকরা অপ্রত্যাশিত সমস্যার মুখে না পড়েন।



সাধারণ চালকদের কী করা উচিত?



গাড়ির মালিকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রস্তুতকারক সংস্থার নির্দেশিকা মেনে চলা। আপনার গাড়ি কত শতাংশ ইথানল-সমৃদ্ধ জ্বালানি ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত, তা মালিকের ম্যানুয়াল বা অনুমোদিত সার্ভিস সেন্টার থেকে জেনে নেওয়া উচিত।


যদি ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি ব্যবহারের পরে ইঞ্জিনের অস্বাভাবিক শব্দ, মাইলেজে হঠাৎ পরিবর্তন বা পারফরম্যান্সে সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত অনুমোদিত সার্ভিস সেন্টারে পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।



চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়


ভারতের জ্বালানি নীতিতে ইথানল ব্লেন্ডিং একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হলেও, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে এখনও পর্যবেক্ষণ চলছে। সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্রের সাম্প্রতিক বক্তব্যও সেই বিষয়টিকেই স্পষ্ট করেছে। ফলে ইথানল মিশ্রিত পেট্রলের অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য সামনে আসতে এখনও কিছুটা সময় লাগবে।


পরবর্তী মূল্যায়নের ফলাফল প্রকাশের পরই এই নীতির কার্যকারিতা, সাধারণ মানুষের উপকার এবং যানবাহনের ওপর এর বাস্তব প্রভাব সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ছবি পাওয়া যাবে। ততদিন পর্যন্ত সচেতনভাবে গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং সরকারি ও প্রস্তুতকারক সংস্থার নির্দেশিকা মেনে চলাই হবে সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!