বাদল অধিবেশনে ফের আলোচনায় ‘দাগি’ জনপ্রতিনিধি বিল, কী বদল হতে পারে?

NEWS INDIA বাংলা
0
Monsoon Session proposed bill on criminal lawmakers Parliament India


রাজনীতিতে অপরাধমূলক অভিযোগে অভিযুক্ত জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলছে। সেই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করতে চলেছে কেন্দ্রের প্রস্তাবিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিল। সূত্রের খবর, প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী এবং অন্যান্য মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে গুরুতর ফৌজদারি মামলায় দীর্ঘদিন কারাবন্দি থাকলে তাঁদের পদ থেকে অপসারণের বিধান সংক্রান্ত বিলটি ফের সংসদের বাদল অধিবেশনে আনা হতে পারে। ইতিমধ্যেই প্রস্তাবটি যৌথ সংসদীয় কমিটির (JPC) কাছে পাঠানো হয়েছে। সংশোধনের পর সেটি আবার সংসদে তোলা হতে পারে বলেই রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে।


এই বিলকে ঘিরে যেমন সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের বার্তা দিতে চাইছে, তেমনই বিরোধীদের একাংশের অভিযোগ—এটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে প্রশাসনিকভাবে চাপে রাখার নতুন কৌশল হতে পারে। ফলে সংসদের আগামী অধিবেশন যে এই ইস্যুতে উত্তপ্ত হতে চলেছে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।




কী রয়েছে প্রস্তাবিত বিলে?



গত বছরের বাদল অধিবেশনের শেষ দিনে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ লোকসভায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সংশোধনী বিল পেশ করেছিলেন। সেই বিলগুলির অন্যতম লক্ষ্য ছিল—গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত হয়ে দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকা অবস্থায় কোনও সাংবিধানিক পদাধিকারী যাতে দায়িত্বে বহাল থাকতে না পারেন, তার আইনি কাঠামো তৈরি করা।


প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, কোনও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বা মন্ত্রী যদি কোনও গুরুতর অপরাধে গ্রেফতার হয়ে টানা ৩০ দিনের বেশি জেল হেফাজতে থাকেন, তাহলে তাঁদের পদে থাকার যোগ্যতা নিয়ে পুনর্বিবেচনার ব্যবস্থা করা হতে পারে। সরকারের দাবি, প্রশাসনের শীর্ষ পদে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ।




সরকারের যুক্তি কী?



কেন্দ্রের বক্তব্য, দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যদি গুরুতর অপরাধের অভিযোগ থাকে এবং তাঁরা দীর্ঘ সময় জেলে থাকেন, তাহলে সেই পরিস্থিতি প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। তাই সাধারণ জনপ্রতিনিধিদের মতোই মন্ত্রীদের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট আইনি কাঠামো থাকা প্রয়োজন।


সরকারি মহলের মতে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে ব্যক্তি নয়, নীতিকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। সেই কারণেই সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তিদের জন্যও স্পষ্ট নিয়ম প্রয়োজন।




বিরোধীদের আপত্তি কোথায়?



প্রস্তাবটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই বিরোধী দলগুলির তীব্র আপত্তি সামনে আসে। কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, ডিএমকে-সহ একাধিক দল অভিযোগ তোলে, এই বিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ব্যবহার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


বিরোধীদের যুক্তি, অনেক ক্ষেত্রেই তদন্ত বা বিচার শেষ হওয়ার আগেই রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়। সেই অবস্থায় শুধুমাত্র গ্রেফতার বা দীর্ঘ হেফাজতের ভিত্তিতে কোনও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে পদচ্যুত করার বিধান গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।


তৃণমূল কংগ্রেসও আগেই এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছিল। দলের বক্তব্য ছিল, নির্বাচিত সরকারকে প্রশাসনিকভাবে দুর্বল করার হাতিয়ার হিসেবে এই আইন ব্যবহার করা হতে পারে। একই ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল ‘ইন্ডিয়া’ জোটের অন্য শরিক দলগুলিও।




কেন পাঠানো হয়েছিল যৌথ সংসদীয় কমিটিতে?



বিলটি নিয়ে সংসদে প্রবল মতবিরোধ তৈরি হওয়ায় সরকার সেটিকে ভোটাভুটিতে না নিয়ে যৌথ সংসদীয় কমিটির কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ, আইনজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট মহলের মতামত নিয়ে বিলটি আরও পর্যালোচনা করার দায়িত্ব দেওয়া হয় কমিটিকে।


সূত্রের খবর, কমিটি ইতিমধ্যেই বিভিন্ন পক্ষের মতামত সংগ্রহ করেছে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাদের সুপারিশ জমা পড়তে পারে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই সংশোধিত বিল সংসদে ফের তোলা হতে পারে বলে আলোচনা চলছে।




কমিটিতে কারা রয়েছেন?


যৌথ সংসদীয় কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন বিজেপি সাংসদ অপরাজিতা সারেঙ্গী। কমিটিতে শাসক ও বিরোধী—উভয় শিবিরের সদস্যরাই রয়েছেন। বিরোধী শিবিরের মধ্যে রয়েছেন আসাদউদ্দিন ওয়েইসি, সুপ্রিয়া সুলে-সহ একাধিক সাংসদ।


তবে সংখ্যার নিরিখে শাসক দলের প্রতিনিধিরাই এগিয়ে থাকায় চূড়ান্ত সুপারিশে সরকারের অবস্থানই প্রাধান্য পেতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের ধারণা। যদিও বিরোধী সদস্যরা প্রয়োজন হলে ‘ডিসেন্ট নোট’ জমা দিয়ে নিজেদের আপত্তি নথিভুক্ত করতে পারেন।





রাজনৈতিক সূত্রে জোর জল্পনা, সংসদের আসন্ন বাদল অধিবেশনেই সংশোধিত বিলটি আবার পেশ করা হতে পারে। যদি যৌথ সংসদীয় কমিটি ছাড়পত্র দেয়, তাহলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজেই বিলটি সংসদে উত্থাপন করতে পারেন।


তবে এই বিল সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এটি পাশ করাতে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা যথেষ্ট হবে না। লোকসভা ও রাজ্যসভা—দুই কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন হবে। ফলে বিরোধী দলগুলির অবস্থান এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।




সাংসদ ভাঙানো নিয়ে কেন উঠছে প্রশ্ন?


এই বিলকে কেন্দ্র করেই রাজনৈতিক মহলে আরেকটি জল্পনা ঘুরছে। সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন আঞ্চলিক দলের সাংসদদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চলছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।


কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দলের সাংসদদের অবস্থান পরিবর্তন, দলবদল বা রাজনৈতিক সমীকরণের পরিবর্তনের সঙ্গে এই বিলের সম্ভাব্য ভোটাভুটির যোগ রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। যদিও এই বিষয়ে এখনও কোনও সরকারি তথ্য বা প্রমাণ সামনে আসেনি। ফলে বিষয়টি আপাতত রাজনৈতিক জল্পনার পর্যায়েই রয়েছে।




সামনে কী হতে পারে?


যদি বিলটি সংসদে পেশ হয় এবং প্রয়োজনীয় সমর্থন পায়, তাহলে দেশের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে। একদিকে এটি প্রশাসনের শীর্ষস্তরে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার নতুন মানদণ্ড তৈরি করতে পারে বলে সরকারের দাবি। অন্যদিকে বিরোধীদের আশঙ্কা, আইনটির অপব্যবহার হলে নির্বাচিত সরকারগুলির স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।


ফলে আগামী বাদল অধিবেশনে এই বিল ঘিরে তুমুল বিতর্ক, দীর্ঘ আলোচনা এবং রাজনৈতিক সংঘাতের সম্ভাবনাই বেশি। শুধু সংসদের ভেতরেই নয়, দেশের রাজনৈতিক মহলেও এই প্রস্তাব আগামী কয়েক সপ্তাহ অন্যতম আলোচিত ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!