কলকাতা পুরভোটের প্রস্তুতি তুঙ্গে, ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসে বদলাচ্ছে রাজনৈতিক সমীকরণ!
ওয়ার্ডের সীমানা বদলেই কি বদলাবে কলকাতার পুরভোটের অঙ্ক? ডিসেম্বরের ভোট ঘিরে বাড়ছে তৎপরতা
কলকাতা পুরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক—দুই স্তরেই তৎপরতা বাড়ছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর বদলে যাওয়া রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে এবার কলকাতা পুরভোটকে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জুনে জানিয়েছিলেন, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই কলকাতা পুরসভায় নির্বাচিত বোর্ড ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। ফলে হাতে সময় কম থাকায় ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস, সাংগঠনিক প্রস্তুতি এবং সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই—সব ক্ষেত্রেই গতি বাড়ছে।
নির্বাচনের আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়াগুলির একটি হল ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস বা Delimitation। কলকাতা পুরসভার তরফে প্রস্তাবিত ওয়ার্ড সীমানা নিয়ে খসড়া বিজ্ঞপ্তি এবং আপত্তি ও পরামর্শ জানানোর প্রক্রিয়া সংক্রান্ত নোটিস প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে কোন এলাকার সীমানা কীভাবে বদলাবে, ভোটারদের ভৌগোলিক বিন্যাসে কী পরিবর্তন হবে এবং নতুন কাঠামো রাজনৈতিক দলগুলির সমীকরণে কী প্রভাব ফেলবে—তা এখন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
এই পুনর্বিন্যাসের প্রভাব শুধু প্রশাসনিক মানচিত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সম্ভাব্য প্রার্থীদের শক্তি, বুথভিত্তিক সংগঠন এবং স্থানীয় ভোটব্যাঙ্কের হিসাবেও পরিবর্তন আসতে পারে। তাই রাজনৈতিক দলগুলি ওয়ার্ড ধরে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে। খসড়া সীমানা নিয়ে আপত্তি বা পরামর্শ জমা পড়ার পর প্রয়োজনীয় সংশোধন হলে চূড়ান্ত কাঠামো আরও স্পষ্ট হবে।
এর মধ্যেই কলকাতা পুরসভার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘদিনের মেয়র ফিরহাদ হাকিম জুনে মেয়র পদ থেকে ইস্তফা দেন। তাঁর পদত্যাগের পর রাজ্য সরকার পুরবোর্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে পদক্ষেপ করে এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচিত বোর্ডের পরিবর্তে প্রশাসক নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়।
এই পরিস্থিতিতে আসন্ন পুরভোট তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ২০২১ সালের পুরভোটে কলকাতার ১৪৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে তৃণমূল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর রাজ্যের ক্ষমতার পালাবদল সেই পুরনো রাজনৈতিক সমীকরণকে নতুন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। শহরের ভোটারদের মধ্যে বিধানসভা নির্বাচনের ফলের প্রভাব পুরভোটে কতটা পড়ে, সেটিই এখন অন্যতম বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন।
বিজেপির কাছেও কলকাতা পুরভোট বড় পরীক্ষা। রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর কলকাতার মতো গুরুত্বপূর্ণ নগর এলাকায় দল কতটা শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি করতে পারে, তার বাস্তব পরীক্ষা হবে এই নির্বাচনে। অন্যদিকে তৃণমূলের সামনে থাকবে দীর্ঘদিনের পুর-সংগঠন ধরে রাখা এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভোটারদের আস্থা বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ।
বাম শিবিরও স্থানীয় স্তরে সংগঠন পুনর্গঠনের দিকে নজর দিচ্ছে। পাড়াভিত্তিক যোগাযোগ, স্থানীয় সমস্যা নিয়ে আন্দোলন এবং সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ের মাধ্যমে পুরভোটের প্রস্তুতি নেওয়ার চেষ্টা চলছে। ফলে লড়াই শুধু তৃণমূল-বিজেপির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, সেদিকেও নজর রয়েছে।
তবে এখনও চূড়ান্ত নির্বাচনী সূচি, পূর্ণাঙ্গ প্রার্থী তালিকা কিংবা ওয়ার্ডভিত্তিক আসন সমঝোতা ঘোষণা হয়নি। তাই কোন দল কতগুলি আসন পাবে বা কোন ওয়ার্ডে কে প্রার্থী হবেন—এমন কোনও আগাম সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না।
সব মিলিয়ে, কলকাতা পুরভোট এখন তিনটি বিষয়ের উপর নির্ভরশীল—ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের চূড়ান্ত রূপ, রাজনৈতিক দলগুলির সাংগঠনিক প্রস্তুতি এবং প্রার্থী বাছাই। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে নির্বাচিত বোর্ড ফেরানোর লক্ষ্যের কারণে আগামী কয়েক মাসে কলকাতার প্রতিটি ওয়ার্ডেই রাজনৈতিক তৎপরতা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

