রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে নতুন তৎপরতা, Air Defence থেকে শান্তি আলোচনা, ইউরোপের নিরাপত্তায় বাড়ছে উদ্বেগ
ইউক্রেন যুদ্ধের মাঝেই ইউরোপে নতুন সমীকরণ, Air Defence ও শান্তি আলোচনায় কেন বাড়ছে তৎপরতা?
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতার মধ্যেই ইউরোপের নিরাপত্তা এবং সম্ভাব্য শান্তি আলোচনায় নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। একদিকে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলায় ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা (Air Defence) ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে পশ্চিমা দেশগুলির কাছে আরও অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র চেয়ে আবেদন জানাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। অন্যদিকে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনায় ইউরোপের সরাসরি ভূমিকা নিশ্চিত করতে ফ্রান্স, জার্মানি ও ব্রিটেন নিজেদের মধ্যে সমন্বয় বাড়াচ্ছে। ফলে যুদ্ধের সামরিক পরিস্থিতির পাশাপাশি ভবিষ্যৎ ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
সম্প্রতি মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিও এবং ব্রিটিশ বিদেশমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ডের বৈঠকেও ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আরও বড় ভূমিকার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। ব্রিটিশ পক্ষের বক্তব্য, ইউক্রেনের নিরাপত্তা ইউরোপ এবং বৃহত্তর ট্রান্সআটলান্টিক নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। একই সময়ে কিয়েভ মিত্র দেশগুলির কাছে আরও এয়ার ডিফেন্স মিসাইল চেয়ে আবেদন জোরদার করেছে।
এই মুহূর্তে ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা আকাশ প্রতিরক্ষা। কিয়েভের দাবি, রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ও অন্যান্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাত্রা বাড়ায় Patriot-এর মতো উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজনও বেড়েছে। Reuters-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে ইউক্রেনে সরবরাহ করা air-defence interceptor-এর পরিমাণ ২০২৫ সালের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে বলে জেলেনস্কি জানিয়েছেন। ফলে শহর, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো রক্ষায় ইউরোপীয় দেশগুলির হাতে থাকা প্রতিরক্ষা সামগ্রীর দিকে নজর আরও বেড়েছে।
ওয়াশিংটন ও কিয়েভের মধ্যে Patriot interceptor উৎপাদন নিয়েও আলোচনা চলছে। সম্ভাব্য ব্যবস্থার মধ্যে ইউক্রেনে কিছু উপাদান তৈরি করে ইউরোপে, বিশেষ করে জার্মানিতে, চূড়ান্ত সংযোজনের বিষয়টি রয়েছে বলে Reuters জানিয়েছে। তবে নতুন উৎপাদন শুরু হলেও ক্ষেপণাস্ত্র হাতে পেতে এক বছর বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে। তাই তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে ইউক্রেন এখনও মিত্র দেশগুলির মজুত থেকে ক্ষেপণাস্ত্র পাওয়ার চেষ্টা করছে।
ইউরোপের জন্য এই পরিস্থিতি শুধু ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয় নয়। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় ইউরোপীয় দেশগুলি নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো, অস্ত্র উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পূর্ব সীমান্তের নিরাপত্তা জোরদারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে। রোমানিয়ার আকাশসীমায় সন্দেহভাজন রুশ ড্রোন ঢোকার পর NATO air-policing মিশনের একটি F-18 সেটিকে গুলি করে নামিয়েছে বলে রোমানিয়া জানিয়েছে। ঘটনাটি ইউক্রেন যুদ্ধের সামরিক ঝুঁকি ইউরোপের NATO সদস্যদের আকাশসীমার কাছেও পৌঁছে যাওয়ার উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে ও জুনে ইউক্রেনের জন্য সহায়তার বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নতুন Ukraine Support Loan-এর মাধ্যমে ওই দুই মাসে প্রায় ১১ বিলিয়ন ইউরো বরাদ্দ করা হয়েছে। ফলে সামরিক সাহায্যের পাশাপাশি ইউরোপের প্রতিরক্ষা শিল্পে দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির প্রশ্নও সামনে এসেছে। অর্থাৎ লক্ষ্য শুধু জরুরি অস্ত্র পাঠানো নয়, ভবিষ্যতের জন্য একটি স্থায়ী প্রতিরক্ষা সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলাও।
এরই মধ্যে ফ্রান্স, জার্মানি ও ব্রিটেন সম্ভাব্য ইউক্রেন শান্তি আলোচনায় ইউরোপের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সমন্বিত কাঠামো নিয়ে কাজ করছে বলে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধের ফলাফল এবং রাশিয়ার সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক সরাসরি ইউরোপের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। তাই ওয়াশিংটন ও মস্কোর মধ্যে কোনও সমঝোতা হলে ইউরোপের স্বার্থ যাতে উপেক্ষিত না হয়, সেই লক্ষ্যেই আগাম অবস্থান তৈরি করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে ইউরোপের সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ। একদিকে ইউক্রেনকে তাৎক্ষণিক সামরিক সহায়তা দেওয়া, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি ও কূটনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করা। এই দুই লক্ষ্যকে সমন্বয় করেই আগামী দিনের নীতি নির্ধারণ করতে হবে।
সব মিলিয়ে, ইউক্রেন যুদ্ধ এখন শুধু রাশিয়া ও ইউক্রেনের সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে ইউরোপের প্রতিরক্ষা নীতি, NATO-র ভবিষ্যৎ ভূমিকা এবং মার্কিন নিরাপত্তা সহায়তার ওপর ইউরোপের নির্ভরতার প্রশ্ন। ফলে শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা যত বাড়বে, ইউরোপের নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক ভূমিকা ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তবে যুদ্ধবিরতি বা স্থায়ী শান্তির বিষয়ে এখনও কোনও নিশ্চিত সমঝোতা হয়নি।

