মির্জা গালিব স্ট্রিটে হোটেল অগ্নিকাণ্ডে ৯ মৃত্যু, ফের প্রশ্নের মুখে কলকাতার Fire Safety
ঘিঞ্জি এলাকায় হোটেল-গেস্ট হাউসের জরুরি বহির্গমন ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
নিউজ ইন্ডিয়া ওয়েব ডেস্কঃ কলকাতার কেন্দ্রস্থলে মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি পাঁচতলা ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৯ জনের মৃত্যুর পর ফের বড় প্রশ্নের মুখে শহরের ঘিঞ্জি এলাকায় থাকা হোটেল ও গেস্ট হাউসগুলির অগ্নিনিরাপত্তা (Fire Safety)। বুধবার ভোররাতে আগুন লাগা ওই ভবনে একাধিক হোটেল চলত। ঘটনায় আরও ছয়জন আহত হয়েছেন। দমকল, পুলিশ ও বিপর্যয় মোকাবিলা দলের তৎপরতায় প্রায় ৮০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, রাত প্রায় ১টা ৪৫ মিনিট নাগাদ আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে ভবনের একাধিক অংশে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। ঘন কালো ধোঁয়ার কারণে উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ভবনের সরু সিঁড়ি এবং বহু ঘরে পর্যাপ্ত জানালা বা বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা না থাকায় আবাসিকদের নিরাপদে বের করে আনা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। উদ্ধারকারীরা জানালা ভেঙেও কয়েকজনকে বাইরে বের করে আনেন।
এই ঘটনার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে, পুরনো ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় থাকা হোটেলগুলিতে আদৌ কতটা কার্যকর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। জরুরি বহির্গমন পথ (Emergency Exit), পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম এবং বিপদের সময় দ্রুত ভবন খালি করার মতো ব্যবস্থা ঠিকঠাক রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ আগুন লাগার পরে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়লে একটি মাত্র সিঁড়ি বা সংকীর্ণ বেরোনোর পথই আটকে পড়া মানুষের জন্য বড় বিপদ হয়ে উঠতে পারে।
মির্জা গালিব স্ট্রিটের মতো কেন্দ্রীয় কলকাতার ব্যস্ত এলাকায় রাস্তা ও ভবনের ঘনত্বও উদ্ধারকাজে প্রভাব ফেলতে পারে। এই এলাকায় বহু পুরনো ভবন, ছোট হোটেল, গেস্ট হাউস এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ফলে একটি ভবনে আগুন লাগলে দ্রুত আগুন ও ধোঁয়া ছড়ানোর পাশাপাশি দমকলের গাড়ি নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছনো এবং উদ্ধার অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন হয়।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ নিয়েও তদন্ত শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটের সম্ভাবনার কথা সামনে এলেও ফরেনসিক তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে আগুনের কারণ বলা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে ভবনটির নির্মাণ কাঠামো, হোটেল পরিচালনার অনুমোদন এবং অগ্নিনিরাপত্তা সংক্রান্ত নিয়মকানুন কতটা মেনে চলা হয়েছিল, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এই ঘটনার পরে রাজ্যজুড়ে হোটেল ও গেস্ট হাউসগুলিতে অগ্নিনিরাপত্তা পরিদর্শনের প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালো হয়েছে। প্রশাসনের তরফে রাজ্যের হোটেলগুলিতে Fire Safety Inspection করার পরিকল্পনার কথাও সামনে এসেছে। নিয়মিত অগ্নিনিরাপত্তা অডিট হলে কোথায় জরুরি নির্গমন পথ নেই, কোথায় পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই বা কোথায় ভবনের কাঠামো ঝুঁকিপূর্ণ, তা আগেই চিহ্নিত করা সম্ভব।
এর মাত্র কয়েক দিন আগেও রাজ্যের অন্য একটি হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা সামনে এসেছিল। ফলে পরপর এমন ঘটনার পর শুধু নির্দিষ্ট একটি ভবন নয়, কলকাতা ও রাজ্যের পুরনো হোটেল-গেস্ট হাউসগুলির সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে পর্যালোচনার দাবি উঠছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, অগ্নিনিরাপত্তা শুধু আগুন নেভানোর সরঞ্জাম রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আগুন লাগার মুহূর্তে অতিথিরা যাতে দ্রুত বেরিয়ে যেতে পারেন, সেই অনুযায়ী নিরাপদ সিঁড়ি, জরুরি বহির্গমন, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস এবং নিয়মিত মহড়া থাকা জরুরি। মির্জা গালিব স্ট্রিটের মর্মান্তিক ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, কাগজে-কলমে নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা আর বাস্তবে তা কার্যকর থাকা এক বিষয় নয়। এখন তদন্তের পাশাপাশি শহরের হোটেল ও গেস্ট হাউসগুলির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র খতিয়ে দেখাই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

