গোর্খা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে বড় পদক্ষেপ, অমিত শাহের বৈঠকের পর পঙ্কজ সিংহের নেতৃত্বে কমিটি
সুকনার বৈঠকের পর নতুন আশার আলো, গোর্খা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কমিটি গড়ল কেন্দ্র
দার্জিলিং পাহাড়, তরাই ও ডুয়ার্সের দীর্ঘদিনের গোর্খা রাজনৈতিক সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে বড় পদক্ষেপ করল কেন্দ্র। শনিবার, ২২ আগস্ট শিলিগুড়ির সুকনায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পর পাহাড়ের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমস্যার সমাধানের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রের নিযুক্ত interlocutor বা আলোচনাকারী প্রতিনিধি পঙ্কজ কুমার সিংহের নেতৃত্বেই এই কমিটি কাজ করবে।
কেন্দ্রের প্রস্তাবিত উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হল গোর্খা সম্প্রদায় এবং পাহাড়, তরাই ও ডুয়ার্স এলাকার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দাবিগুলি নিয়ে আলোচনা করে একটি ‘Permanent Political Solution’-এর (স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান) কাঠামো তৈরি করা। সেই সমাধান অবশ্যই ভারতের সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে হতে হবে। ফলে এই মুহূর্তে পৃথক গোর্খাল্যান্ড রাজ্য গঠনের কোনও সরাসরি সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি। বরং আলোচনার মাধ্যমে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে একটি স্থায়ী সমাধানের পথ খোঁজার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শনিবারের বৈঠকে কেন্দ্র ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি পাহাড়ের একাধিক রাজনৈতিক দলের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। সরকারি সম্প্রচারমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, বৈঠকে মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল, interlocutor পঙ্কজ সিংহ, IB Director মহেশ দীক্ষিত, পাহাড় বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বিশাল লামা, দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা, রাজ্যসভার সাংসদ হর্ষবর্ধন শ্রিংলা, Gorkha Janmukti Morcha (GJM)-র সভাপতি বিমল গুরুং এবং Gorkha National Liberation Front (GNLF)-এর সভাপতি মন ঘিসিং-সহ একাধিক নেতা উপস্থিত ছিলেন।
পঙ্কজ কুমার সিংহের নেতৃত্বে এই কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। ২০২৫ সালে কেন্দ্র তাঁকে দার্জিলিং পাহাড়, তরাই ও ডুয়ার্সের গোর্খা-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য interlocutor হিসেবে নিযুক্ত করেছিল। অবসরপ্রাপ্ত IPS আধিকারিক সিংহ আগে BSF-এর Director General এবং Deputy National Security Adviser হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ২০২৬ সালের টেলিফোন ডিরেক্টরিতেও তাঁকে গোর্খা বিষয়ক interlocutor ও Government of India Representative হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
গোর্খাল্যান্ডের দাবি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বহু দশকের পুরনো। দার্জিলিং, কালিম্পং ও কার্শিয়াং-সহ পাহাড়ি এলাকায় পৃথক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অধিকারের দাবিতে অতীতে একাধিক বড় আন্দোলন হয়েছে। ২০১১ সালে Gorkhaland Territorial Administration বা GTA গঠনের মাধ্যমে একটি স্বশাসিত প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি হলেও বৃহত্তর রাজনৈতিক সমাধানের প্রশ্নটি অমীমাংসিত থেকে যায়।
এবার নতুন কমিটি সেই দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত প্রশ্নকে আবার আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসছে। তবে কমিটি গঠন মানেই গোর্খাল্যান্ড সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান হয়ে গিয়েছে—এমনটা বলার সুযোগ নেই। কমিটিকে পাহাড়ের রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন এবং অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা করে সুপারিশ তৈরি করতে হবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, পাহাড়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পৃথক দাবি কতটা এক জায়গায় আনা সম্ভব হবে এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অবস্থানের সঙ্গে সেই দাবিগুলির কতটা সমন্বয় করা যাবে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বৈঠকে রাজ্য ভাগের কোনও প্রস্তাব মেনে নেওয়া হবে না বলে অবস্থান স্পষ্ট করলেও অন্য কোনও স্থায়ী সমাধানের পথে কাজ করার কথা জানিয়েছেন বলে রিপোর্ট হয়েছে।
ফলে শনিবারের বৈঠককে গোর্খা সমস্যার সমাধানের শেষ ধাপ নয়, বরং নতুন একটি রাজনৈতিক আলোচনাপ্রক্রিয়ার সূচনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। এখন নজর থাকবে পঙ্কজ সিংহের নেতৃত্বাধীন কমিটি কী প্রস্তাব দেয় এবং দীর্ঘদিনের এই পাহাড়ি সমস্যাকে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে কতটা কার্যকর সমাধানের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।

