ফের বাড়ল সোনা-রুপোর দাম, ৪৪০০ ডলারের ঘরে Gold! ফেডের সিদ্ধান্তে নজর বাজারের
সোমবার ফের চড়ল সোনা ও রুপোর দাম, দুর্বল ডলার আর ফেডের সিদ্ধান্ত ঘিরে কেন বাড়ছে বাজারের আকর্ষণ?
আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ার সঙ্গে ফের বিনিয়োগকারীদের নজরের কেন্দ্রে উঠে এসেছে সোনা ও রুপো। সোমবার, ১৭ আগস্ট, বিশ্ববাজারে দুই মূল্যবান ধাতুর দামই বেড়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, স্পট গোল্ড প্রায় ০.৬ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪,৪০০.১৫ ডলারে পৌঁছয়। একই সময়ে স্পট সিলভার ১.৮ শতাংশ বেড়ে ৬৫.৮২ ডলারে ওঠে। দুর্বল মার্কিন ডলার এবং সেপ্টেম্বরের বৈঠকে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা কমে যাওয়াই এই ঊর্ধ্বগতির অন্যতম কারণ।
সোনার ক্ষেত্রে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে মার্কিন অর্থনীতির সাম্প্রতিক কিছু দুর্বল তথ্য। জুলাইয়ের কর্মসংস্থান তথ্য এবং তুলনামূলক নরম মূল্যস্ফীতির পর বাজারে ফেডের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে প্রত্যাশা বদলেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের বৈঠকে সুদ বাড়ার সম্ভাবনা এখন প্রায় ২৯ শতাংশে নেমে এসেছে, যা এক মাস আগে ছিল ৪৭ শতাংশ। সুদের হার কম থাকার সম্ভাবনা বাড়লে সুদ না-দেওয়া সম্পদ হিসেবে সোনার সুযোগমূল্য কমে যায়। ফলে বিনিয়োগকারীদের কাছে হলুদ ধাতুর আকর্ষণ বাড়ে।
দুর্বল ডলারও সোনার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ডলারে মূল্য নির্ধারিত হওয়ায় মার্কিন মুদ্রার দর কমলে অন্যান্য মুদ্রায় থাকা বিনিয়োগকারীদের কাছে সোনা তুলনামূলক সস্তা হয়ে ওঠে। সোমবার ডলার সূচকও দুর্বল হয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরে চলমান ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে সোনার চাহিদা বাড়িয়ে দিচ্ছে। তবে শুধু ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনাকেই বর্তমান বৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখছেন না বাজার বিশ্লেষকেরা।
ভারতের কমোডিটি বাজারেও আন্তর্জাতিক প্রবণতার প্রভাব পড়েছে। ১৭ আগস্ট সকালে MCX-এ অক্টোবর ডেলিভারির সোনা ১০ গ্রামে ১.৫৪ লক্ষ টাকার উপরে লেনদেন করছিল এবং বাজার তথ্যে প্রায় ১,৫৪,৫৯০ টাকার দর দেখা যায়। একই সময়ে সিলভার M কনট্র্যাক্টের দামও প্রতি কেজিতে ২.৩৮ লক্ষ টাকার আশপাশে ছিল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের ঊর্ধ্বগতি ভারতীয় কমোডিটি মার্কেটেও প্রতিফলিত হচ্ছে।
সোনার পাশাপাশি রুপোর বাজারেও আলাদা করে নজর রয়েছে। রুপো শিল্পক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হওয়ায় এর দামের ওপর বিনিয়োগ চাহিদার পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন, প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক পণ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির গতির প্রভাব পড়ে। ফলে রুপোর দাম অনেক সময় সোনার তুলনায় দ্রুত ওঠানামা করতে পারে। সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে ১.৮ শতাংশ বৃদ্ধিও সেই অস্থিরতার দিকটি সামনে এনেছে।
ভারতের বাজারে আরও একটি বড় বিষয় হল টাকার বিনিময়মূল্য। সোমবার রুপি ডলারের বিপরীতে ৯৫.৬০ পর্যন্ত নেমে যায়, যা দুই সপ্তাহের মধ্যে দুর্বলতম স্তর। আমদানিনির্ভর হওয়ায় রুপি দুর্বল হলে আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারে নির্ধারিত সোনা ও রুপো দেশে কিনতে খরচ বাড়তে পারে। ফলে বিশ্ববাজারে দাম স্থির থাকলেও দেশীয় বাজারে মূল্যচাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
দেশীয় ক্রেতাদের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। বিয়ে ও উৎসবের মরসুম সামনে থাকলে গয়নার চাহিদা বাড়তে পারে, যা খুচরো বাজারে সোনার দামের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের দামই খুচরো গয়নার চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণ করে না। আমদানি খরচ, ডলারের বিনিময় হার, শুল্ক, স্থানীয় চাহিদা এবং গয়না তৈরির খরচও চূড়ান্ত দামে প্রভাব ফেলে। রুপোর ক্ষেত্রেও শিল্পের চাহিদা বাড়লে বাজারে অতিরিক্ত সমর্থন তৈরি হতে পারে।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার পরবর্তী বড় বাধা হিসেবে ৪,৫০০ ডলারের স্তরকে গুরুত্ব দিচ্ছেন বাজার পর্যবেক্ষকেরা। রয়টার্সের বিশ্লেষণে ইঙ্গিত মিলেছে, এই স্তরের ওপরে টেকসই উত্থানের জন্য আরও দুর্বল ডলার বা জ্বালানির দামে পতনের মতো অতিরিক্ত অনুঘটক প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ বর্তমান ঊর্ধ্বগতি থাকলেও সামনে বাজারে ওঠানামার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
আগামী দিনে তাই সোনা-রুপোর বাজারে নজর থাকবে ফেডের নীতি, মার্কিন অর্থনৈতিক তথ্য, ডলারের গতি, তেলের দাম এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির ওপর। পাশাপাশি ভারতের ক্ষেত্রে রুপির অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সোনার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা শক্তিশালী হলেও হঠাৎ মুনাফা তোলার কারণে দামে সংশোধনও হতে পারে। তাই এক দিনের দাম দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে বৃহত্তর বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করাই গুরুত্বপূর্ণ।

