মমতা–শুভেন্দু সংঘাত তীব্র, অন্নপূর্ণা যোজনা ঘিরে বাড়ছে রাজনৈতিক চাপানউতোর
অন্নপূর্ণার টাকা নিয়ে কেন বাড়ছে বিতর্ক? উপভোক্তা সংখ্যা ও বকেয়া নিয়ে মুখোমুখি দুই শিবির
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে অন্নপূর্ণা যোজনা (Annapurna Yojana) ঘিরে শাসক ও বিরোধী শিবিরের রাজনৈতিক চাপানউতোর আরও তীব্র হয়েছে। মহিলাদের মাসিক আর্থিক সহায়তার এই প্রকল্প এখন শুধু জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি নয়, রাজনৈতিক প্রচার, অভিযোগ এবং পাল্টা দাবিরও অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে যোগ্য উপভোক্তাদের টাকা পাওয়া, আবেদন যাচাই এবং প্রকল্পে নতুন করে নাম অন্তর্ভুক্তি নিয়ে অভিযোগ সামনে আসায় বিতর্ক আরও বেড়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ১৯ মে ২০২৬-এর বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, অন্নপূর্ণা যোজনায় ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সি যোগ্য মহিলাদের মাসে ৩,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। সরকারি চাকরি বা নির্দিষ্ট সরকারি বেতন-পেনশন পাওয়া এবং Income Tax প্রদানকারী মহিলারা এই সুবিধার আওতায় পড়বেন না। অর্থ Aadhaar-linked ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে Direct Benefit Transfer বা DBT-এর মাধ্যমে দেওয়ার কথা।
প্রকল্পটি জুন মাসে চালু হওয়ার পর প্রথম পর্যায়ে ২৮ লক্ষেরও বেশি মহিলার অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হয়। পরবর্তী পর্যায়ে আরও বড় সংখ্যক উপভোক্তাকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৭ আগস্ট থেকে প্রায় ১ কোটি ৪৫ লক্ষ মহিলা মাসিক ৩,০০০ টাকা করে পেতে শুরু করেছেন বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ১০ জুলাইয়ের আগে আবেদন সম্পূর্ণ করা উপভোক্তাদের এই পর্যায়ে অর্থ দেওয়া হয়েছে; পরে আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে যাচাই শেষে পরবর্তী পর্যায়ে অর্থ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এই পরিসংখ্যানই এখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে। বিরোধী তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, নির্বাচনের আগে যে পরিমাণ মহিলাকে প্রকল্পের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তার তুলনায় উপভোক্তার সংখ্যা কমেছে। বিভিন্ন জেলায় যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও টাকা না পাওয়ার অভিযোগ তুলে মহিলাদের বিক্ষোভের খবরও সামনে এসেছে। কোথাও কোথাও রেললাইন ও জাতীয় সড়ক অবরোধের মতো কর্মসূচিও হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং রাজ্য বিজেপির বক্তব্য, প্রকল্পে টাকা দেওয়ার আগে উপভোক্তাদের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। সরকারি প্রশাসন ইতিমধ্যেই database verification ও cleansing-এর প্রক্রিয়া চালু করেছিল, যাতে অযোগ্য বা ভুল নাম বাদ দিয়ে প্রকৃত উপভোক্তাদের চিহ্নিত করা যায়।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, যাচাই প্রক্রিয়া শেষ হলে নতুন উপভোক্তাদেরও অর্থ দেওয়া হবে। প্রযুক্তিগত সমস্যা বা তথ্য যাচাইয়ের কারণে কোথাও টাকা পৌঁছতে দেরি হলে তা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও শাসকপক্ষের বক্তব্য। রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও দাবি করেছেন, আরও প্রায় ৫০ লক্ষ মহিলাকে প্রকল্পে যুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।
ফলে অন্নপূর্ণা যোজনার বিতর্কের আসল প্রশ্ন এখন দুটি—কতজন প্রকৃত যোগ্য মহিলা এখনও টাকা পাননি এবং তাঁদের টাকা না পাওয়ার নির্দিষ্ট কারণ কী। রাজনৈতিক অভিযোগের পাশাপাশি এই তথ্য প্রকাশ্যে আসা জরুরি। একই সঙ্গে আবেদন যাচাই, অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং পরবর্তী কিস্তির সময়সীমা কতটা স্বচ্ছভাবে জানানো হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
অন্নপূর্ণা যোজনা যেহেতু সরাসরি মহিলাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেয়, তাই এর বাস্তবায়ন আগামী দিনে রাজ্যের রাজনৈতিক বিতর্কে বড় ভূমিকা নিতে পারে। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের বাইরে সরকারি উপভোক্তা-তথ্য, অর্থপ্রদানের পরিসংখ্যান এবং যাচাইয়ের ফলাফলই শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তব চিত্র স্পষ্ট করবে।

