২৪৭ কলেজের পরিচালন সমিতির মাথায় বিজেপির বিধায়ক-সাংসদ, শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতি নিয়ে ফের প্রশ্ন
কলেজের Governing Body-তে ফের রাজনৈতিক মুখ, ২৪৭ প্রতিষ্ঠানে বিধায়ক-সাংসদদের দায়িত্ব ঘিরে চর্চা
পশ্চিমবঙ্গের সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত কলেজগুলির (State-aided Colleges) পরিচালন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের পথে রাজ্য সরকার। উচ্চশিক্ষা দফতরের সাম্প্রতিক বিজ্ঞপ্তিতে প্রথম দফায় ২৪৭টি কলেজের Governing Body বা পরিচালন সমিতির সভাপতি হিসেবে স্থানীয় গ্র্যাজুয়েট বিধায়ক ও সাংসদদের মনোনীত করা হয়েছে। প্রকাশিত তালিকায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিজেপির জনপ্রতিনিধিদের নাম থাকায় কলেজ প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পর মে মাসে আগের Governing Body-গুলির সভাপতি-সহ মনোনীত সদস্যদের সরিয়ে বিভিন্ন সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত কলেজে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছিল। পাঁচশোরও বেশি কলেজে প্রশাসনিক আধিকারিকদের দায়িত্ব দেওয়ার পর এবার সেই ব্যবস্থা ধাপে ধাপে বদলে নতুন Governing Body গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে উচ্চশিক্ষা দফতর। প্রথম পর্যায়ে ২৪৭টি কলেজের সভাপতিদের নাম প্রকাশ করা হয়েছে।
উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য, স্থানীয় বিধায়ক ও সাংসদরা পদাধিকারবলে কলেজের Governing Body-তে সদস্য হতে পারেন। সেই যুক্তিতেই প্রথম পর্যায়ে গ্র্যাজুয়েট বিধায়ক ও সাংসদদের সভাপতি করা হয়েছে। তাঁর দাবি, এই নিয়োগের আগে দফতরের তরফে screening করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, এখনও ২০০-র বেশি কলেজের পরিচালন সমিতির সভাপতি নিয়োগ বাকি রয়েছে এবং সেখানে শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মীদের দায়িত্ব দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।
প্রকাশিত তালিকায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কলেজের দায়িত্ব পেয়েছেন বিজেপির জনপ্রতিনিধিরা। রাশবিহারী কেন্দ্রের বিধায়ক স্বপন দাশগুপ্তকে আশুতোষ কলেজ, যোগমায়া দেবী কলেজ এবং শ্যামাপ্রসাদ কলেজের Governing Body-র সভাপতি করা হয়েছে। ব্যারাকপুরের বিধায়ক কৌস্তভ বাগচী পেয়েছেন সুরেন্দ্রনাথ ল’ কলেজের দায়িত্ব। কাশীপুরের বিধায়ক ঋতেশ তিওয়ারিকে মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র কলেজ, কাশীশ্বরী কলেজ এবং শেঠ আনন্দারাম জয়পুরিয়া কলেজের সভাপতি করা হয়েছে।
এছাড়াও প্রকাশিত তালিকায় উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়, কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার এবং বিজেপির একাধিক মন্ত্রী, সাংসদ ও বিধায়কের নাম রয়েছে। অর্থাৎ প্রথম দফার তালিকায় শিক্ষাবিদদের তুলনায় রাজনৈতিক জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিই বেশি চোখে পড়ছে।
এই সিদ্ধান্ত নিয়েই তৈরি হয়েছে মূল বিতর্ক। কারণ ক্ষমতায় আসার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী শিক্ষাঙ্গনকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত করার কথা বলেছিলেন। সেই ঘোষণার পর সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত কলেজগুলির পরিচালন সমিতির শীর্ষ পদে একের পর এক নির্বাচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে বসানোয় শিক্ষামহলের একাংশ প্রশ্ন তুলছে—তাহলে কি কলেজ প্রশাসনে রাজনীতির প্রভাব ফেরার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে?
শিক্ষক সংগঠনগুলির একাংশও এই নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাঁদের বক্তব্য, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে Governing Body-র সভাপতি করার সঙ্গে শিক্ষাঙ্গনকে রাজনীতিমুক্ত রাখার ঘোষণার মধ্যে একটি স্পষ্ট দ্বন্দ্ব রয়েছে। অন্যদিকে সরকারের যুক্তি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রশাসনিক ও স্থানীয় উন্নয়নমূলক ভূমিকা থাকতেই পারে এবং Governing Body-তে তাঁদের উপস্থিতি মানেই কলেজকে রাজনৈতিক আখড়ায় পরিণত করা নয়।
আইনগত দিক থেকেও Governing Body-র কাঠামোয় রাজ্য সরকারের ভূমিকা রয়েছে। ২০১৭ সালের West Bengal Universities and Colleges (Administration and Regulation) Act অনুযায়ী সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত কলেজের Governing Body গঠনের বিধান রয়েছে এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে রাজ্য সরকার Governing Body ভেঙে প্রশাসক নিয়োগ করতে পারে।
ফলে ২৪৭টি কলেজে নতুন সভাপতি নিয়োগ একদিকে প্রশাসনিক স্থবিরতা কাটানোর পদক্ষেপ, অন্যদিকে শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে সরকারের নীতির পরীক্ষা। বাকি দুই শতাধিক কলেজে কাদের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং সেখানে শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মীদের কতটা জায়গা দেওয়া হয়, এখন সেদিকেই নজর। শেষ পর্যন্ত কলেজের দৈনন্দিন প্রশাসন, শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় এবং শিক্ষার পরিবেশে এই পরিবর্তনের বাস্তব প্রভাবই ঠিক করবে সিদ্ধান্তটি কতটা কার্যকর হয়েছে।

