জাপানকে ২-১ হারিয়ে শেষ ষোলোয় ব্রাজিল, অতিরিক্ত সময়ে নায়ক মার্তিনেল্লি

NEWS INDIA বাংলা
0
Brazil celebrates 2-1 victory over Japan in FIFA World Cup 2026 knockout match


ফুটবল শুধু গোলের খেলা নয়, এটি আবেগের, সাহসের এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করে যাওয়ার গল্পও। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের নক-আউট পর্বে ব্রাজিল বনাম জাপান ম্যাচটি যেন সেই গল্পকেই নতুন করে জীবন্ত করে তুলল। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত উত্তেজনা ছড়িয়ে ছিল মাঠজুড়ে। শেষ পর্যন্ত সমস্ত চাপ সামলে ২-১ ব্যবধানে জাপানকে হারিয়ে প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল।


শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই ব্রাজিলের ফুটবলারদের প্রতিক্রিয়াই যেন ম্যাচের প্রকৃত ছবি তুলে ধরল। কেউ হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন, কেউ দুই হাত তুলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। কারণ এই জয় সহজ ছিল না। শেষ সেকেন্ড পর্যন্ত জাপান যে লড়াই করেছে, তা বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা নক-আউট লড়াই হিসেবেই মনে রাখা হবে।



শুরুতেই ধাক্কা, জাপানের দুর্দান্ত গোল



ম্যাচের প্রথমার্ধে ব্রাজিল নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দে খেলতে পারেনি। বলের দখল বেশি থাকলেও আক্রমণে ধার ছিল না। বরং মাঝমাঠে আগ্রাসী ফুটবল খেলতে থাকে জাপান। ব্রাজিলের তারকাদের বারবার চাপে ফেলছিল ব্লু সামুরাইরা। ৩১ মিনিটে সেই চাপেরই পুরস্কার পায় এশিয়ার প্রতিনিধিরা।


মাঝমাঠ থেকে বল পেয়ে দুর্দান্ত ব্যক্তিগত দক্ষতায় ব্রাজিলের অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার ক্যাসিমিরোকে কাটিয়ে এগিয়ে যান কাইশু সানো। এরপর ঠান্ডা মাথায় নেওয়া তাঁর নিখুঁত শট ব্রাজিল গোলরক্ষক অ্যালিসন বেকারকে পরাস্ত করে জালে জড়িয়ে যায়। এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে যায় ব্রাজিল সমর্থকদের গ্যালারি। অন্যদিকে জাপানি ফুটবলাররা তখন ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন।


বিরতির পর বদলে গেল ম্যাচের রং


প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়ার পর কার্লো আনচেলত্তি নিজের দলকে নতুন ছন্দে মাঠে নামান। দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই বলের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে জাপানের রক্ষণভাগে ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টি করতে থাকে ব্রাজিল। গোলের সুযোগও তৈরি হচ্ছিল একের পর এক। যদিও শুরুতে কয়েকটি সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হন ভিনিসিয়াস জুনিয়র, রদ্রিগো এবং ক্যাসিমিরো। তবে আক্রমণের ধার একটুও কমায়নি সেলেকাওরা।



ক্যাসিমিরোর হেডারে সমতা



অবশেষে ৫৬ মিনিটে আসে বহু প্রতীক্ষিত গোল। বাঁ প্রান্ত দিয়ে দুর্দান্ত দৌড়ে জাপানের বক্সে ঢুকে পড়েন গ্যাব্রিয়েল। সেখান থেকে নিখুঁত একটি ভাসানো ক্রস পাঠান ব্যাক পোস্টের দিকে।

ঠিক সময়ে উঠে এসে দুর্দান্ত একটি হেড নেন ক্যাসিমিরো। জাপানের গোলরক্ষক জিওন সুজুকি ঝাঁপিয়েও বলের নাগাল পাননি। বল জালে জড়াতেই গ্যালারিতে বিস্ফোরিত হয় ব্রাজিল সমর্থকদের উল্লাস। স্কোরলাইন তখন ১-১। যে ক্যাসিমিরোর ধীরগতির সুযোগ নিয়ে প্রথমার্ধে গোল করেছিল জাপান, তিনিই দ্বিতীয়ার্ধে ব্রাজিলকে ম্যাচে ফিরিয়ে এনে কার্যত নায়ক হয়ে ওঠেন।




শেষ পর্যন্ত লড়াই ছাড়েনি জাপান



সমতায় ফেরার পর ম্যাচ আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। ব্রাজিল একের পর এক আক্রমণ শানাতে থাকে, কিন্তু জাপানের রক্ষণভাগও ছিল অবিশ্বাস্য দৃঢ়। অন্যদিকে সুযোগ পেলেই দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকে উঠে এসে ব্রাজিলের ডিফেন্সকে ব্যস্ত রাখছিল জাপান। দুই দলই জয়ের জন্য মরিয়া ছিল। ফলে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।



অতিরিক্ত সময়ে মার্তিনেল্লির সোনার গোল



অতিরিক্ত সময়ের শেষ ভাগে জাপানের একটি ছোট ভুল পুরো ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেয়। নিজেদের ডিফেন্সের সামনে বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে ভুল করেন জাপানের এক ডিফেন্ডার। সেই সুযোগ হাতছাড়া করেননি গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি। বল কেড়ে নিয়ে দুরন্ত গতিতে বক্সে ঢুকে ঠান্ডা মাথায় ফিনিশ করেন তিনি। ৯৭ মিনিটে করা সেই গোলই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় ব্রাজিল। মনে হচ্ছিল, এবার বুঝি ম্যাচ শেষ। কিন্তু জাপান তখনও হার মানতে রাজি নয়।



শেষ মিনিটে শ্বাসরুদ্ধকর নাটক



অতিরিক্ত সময়ের একেবারে শেষ সেকেন্ড পর্যন্ত জাপান আক্রমণ চালিয়ে যায়। একটি লম্বা বল ব্রাজিলের বক্সে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। বলের দখল নিতে গিয়ে জাপানের ফরোয়ার্ড শোতো মাচিনো ব্রাজিল অধিনায়ক মারকুইনহসকে ফাউল করেন। রেফারি সঙ্গে সঙ্গেই বাঁশি বাজিয়ে ব্রাজিলকে ফ্রি-কিক দেন। তবুও শেষ আক্রমণের চেষ্টা ছাড়েনি জাপান।

আরও একবার ব্রাজিলের বক্সে বল পৌঁছে যায়। কিন্তু মারকুইনহস, মিলিটাও এবং তাঁদের সতীর্থরা তখন যেন মানবপ্রাচীর তৈরি করেছিলেন। একের পর এক ক্লিয়ারেন্সে বিপদ কাটিয়ে দেন ব্রাজিলের ডিফেন্ডাররা। তারপরই বেজে ওঠে শেষ বাঁশি।



স্বস্তির হাসি আনচেলত্তির


শেষ বাঁশির সঙ্গে সঙ্গেই কার্লো আনচেলত্তির মুখেও ফুটে ওঠে স্বস্তির হাসি। পুরো ম্যাচে জাপান ব্রাজিলকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছিল। প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়ার পর দল যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তাতে কোচ হিসেবে নিশ্চয়ই সন্তুষ্ট থাকবেন ইতালীয় এই কিংবদন্তি। বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে ব্রাজিলের মানসিক দৃঢ়তা ছিল প্রশংসার যোগ্য।



হারলেও জাপানের জন্য গর্বের রাত



স্কোরবোর্ডে হার থাকলেও জাপানের ফুটবলারদের পারফরম্যান্স বিশ্ব ফুটবলকে আবারও বুঝিয়ে দিল—এশিয়ার ফুটবল এখন আর কোনও অংশে পিছিয়ে নেই।


ব্রাজিলের মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে প্রায় পুরো ম্যাচ জুড়ে সমানে সমান লড়াই, সংগঠিত রক্ষণ, দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক এবং আত্মবিশ্বাসী ফুটবল—সব মিলিয়ে ব্লু সামুরাইরা কোটি কোটি সমর্থকের হৃদয় জয় করে নিয়েছে। বিশেষ করে কাইশু সানোর পারফরম্যান্স এই ম্যাচের অন্যতম বড় প্রাপ্তি।


এবার সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ



জাপানকে হারিয়ে ব্রাজিল এখন বিশ্বকাপের প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে গেল। তবে এই ম্যাচ স্পষ্ট করে দিল, শুধু তারকার সমাহার থাকলেই বিশ্বকাপ জেতা যায় না। প্রতিটি নক-আউট ম্যাচই আলাদা পরীক্ষা। ব্রাজিলকে পরবর্তী রাউন্ডে আরও ধারালো ফুটবল খেলতে হবে, বিশেষ করে রক্ষণে প্রথমার্ধের ভুলগুলো শুধরে নিতে হবে।


অন্যদিকে, জাপান বিদায় নিলেও তারা প্রমাণ করে গেল—বিশ্ব ফুটবলের শক্তির মানচিত্রে এশিয়ার প্রতিনিধিদের আর কখনও হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। রুদ্ধশ্বাস এই লড়াইয়ের শেষে জয় অবশ্য ব্রাজিলেরই। তবে ফুটবলপ্রেমীরা পেলেন এমন একটি ম্যাচ, যা দীর্ঘদিন স্মৃতিতে থেকে যাবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!