আরজি কর মামলায় প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক নির্মল ঘোষ গ্রেফতার
দ্রুত সৎকারের অভিযোগে নতুন মামলা, তিনজনের বিরুদ্ধে এফআইআর, তদন্তে আরও তথ্য সামনে আসার অপেক্ষা
কলকাতা, ১৩ আগস্ট: আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার দু’বছর পর মামলায় ফের বড়সড় মোড়। মৃত চিকিৎসকের দেহ দ্রুত সৎকারের অভিযোগকে কেন্দ্র করে পানিহাটির প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক নির্মল ঘোষকে গ্রেফতার করেছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। এই ঘটনায় নির্মল ঘোষ ছাড়াও পানিহাটি পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান সোমনাথ দে এবং স্থানীয় নেতা সঞ্জীব মুখোপাধ্যায়ের নাম রয়েছে এফআইআরে। মৃত চিকিৎসকের বাবার অভিযোগের ভিত্তিতেই খড়দহ থানায় নতুন করে মামলা রুজু করা হয়েছিল।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু ২০২৪ সালের ৯ আগস্টের সেই রাত, যখন আরজি কর হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসকের দেহ উদ্ধার হওয়ার পর তাঁর পরিবারকে না জানিয়ে বা পরিবারের আপত্তি উপেক্ষা করে দ্রুত শেষকৃত্য সম্পন্ন করার অভিযোগ ওঠে। পরিবারের তরফে আগে থেকেই দাবি করা হয়েছিল, দেহ সৎকারের আগে প্রয়োজনীয় নথি ও প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁদের যথাযথভাবে অবহিত করা হয়নি। এমনকি দ্রুত সৎকারের ফলে দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্তের সম্ভাবনাও নষ্ট হয়েছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল।
নতুন এফআইআরে বেআইনিভাবে দেহ আটকে রাখা, তথ্য বা প্রমাণ সংক্রান্ত অনিয়ম এবং শ্মশানে অনধিকার প্রবেশের মতো অভিযোগের কথা উঠে এসেছে। পুলিশ সূত্রের দাবি, অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করার পর নির্মল ঘোষের বিরুদ্ধে গ্রেফতারির পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে তদন্তের এই পর্যায়ে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়নি। ফলে গ্রেফতারকে কোনওভাবেই দোষী সাব্যস্ত হওয়ার সমতুল্য হিসেবে দেখা যায় না। মামলায় পরবর্তী তদন্ত এবং আদালতের প্রক্রিয়াই অভিযোগগুলির সত্যতা নির্ধারণ করবে।
ঘটনার রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। নির্মল ঘোষ দীর্ঘদিন পানিহাটি এলাকার তৃণমূল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং প্রাক্তন বিধায়ক হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতি রয়েছে। ফলে আরজি করের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল মামলায় তাঁর গ্রেফতার পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন করে তীব্র বিতর্ক তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে নারী নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা এবং আরজি কর-কাণ্ডের বিচার রাজনৈতিক প্রচারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
এদিকে আরজি কর মামলার মূল ধর্ষণ ও খুনের তদন্তের পাশাপাশি প্রমাণ নষ্ট ও হাসপাতালের প্রশাসনিক অনিয়ম সংক্রান্ত পৃথক তদন্তও চলছে। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা CBI ঘটনাস্থলে উপস্থিত চিকিৎসক ও কর্মীদের নতুন করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা গেছে। ঘটনার রাতের উপস্থিতি, ডিউটি রোস্টার, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং মোবাইল ফোনের ফরেনসিক তথ্যও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
নতুন এফআইআর এবং নির্মল ঘোষের গ্রেফতারির ফলে তদন্তের একটি নতুন দিক সামনে এসেছে। এতদিন মূলত হাসপাতালের ভিতরের ঘটনা, ধর্ষণ ও হত্যার তদন্ত এবং পরবর্তী প্রমাণ সংরক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন ছিল। এবার মৃতদেহ সৎকারের প্রক্রিয়া, সেখানে কারা উপস্থিত ছিলেন, কার নির্দেশে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এবং পরিবারের সঙ্গে কী ধরনের যোগাযোগ হয়েছিল, সেই প্রশ্নগুলিও তদন্তের কেন্দ্রে চলে এসেছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এই নতুন তদন্তের ফল কী হয়, তা এখন দেখার। অভিযোগের প্রতিটি দিকের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ যাচাই এবং আদালতে প্রমাণ উপস্থাপনই শেষ পর্যন্ত প্রকৃত সত্য সামনে আনতে পারে। আরজি কর-কাণ্ডে ন্যায়বিচারের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসা সাধারণ মানুষ ও চিকিৎসক মহলের কাছেও নতুন এই পদক্ষেপ তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই মুহূর্তে মূল প্রশ্ন একটাই: তরুণী চিকিৎসকের দেহ সৎকারের ক্ষেত্রে সত্যিই কোনও বেআইনি হস্তক্ষেপ বা প্রমাণ নষ্টের চেষ্টা হয়েছিল কি না, এবং হয়ে থাকলে তার জন্য কারা দায়ী। তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপেই তার উত্তর মিলবে।

