মেদিনীপুর মেডিক্যালে ফের মেয়াদোত্তীর্ণ স্যালাইন! ৫ জনকে শোকজ স্বাস্থ্য দফতরের
রোগীর শরীরে চলছিল স্যালাইন, বোতল দেখে চমকে গেল পরিবার! মেদিনীপুর মেডিক্যালে ফের বিতর্ক
মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালকে ঘিরে ফের মেয়াদোত্তীর্ণ স্যালাইন ব্যবহারের অভিযোগ সামনে আসায় নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে হাসপাতালের ওষুধ সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থা। এক ৬২ বছরের রোগিণীকে মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়া ডেক্সট্রোজ স্যালাইন দেওয়া হয়েছিল বলে পরিবারের অভিযোগ। বিষয়টি সামনে আসার পর স্বাস্থ্য দফতর তদন্তে নামে এবং হাসপাতালের পাঁচ জন আধিকারিক ও কর্মীকে শোকজ করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে। পশ্চিম মেদিনীপুরের মেদিনীপুর শহরের বিদ্যাসাগরপল্লির বাসিন্দা মানসী দে-কে ৫ জুলাই মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরিবারের দাবি, হৃদ্যন্ত্র ও কিডনির সমস্যার পাশাপাশি তাঁর স্ট্রোকের বিষয়টিও চিকিৎসকদের নজরে আসে। হাসপাতালে চিকিৎসা চলাকালীন তাঁকে স্যালাইন দেওয়া হচ্ছিল। ৮ জুলাই বুধবার রোগিণী বুকে জ্বালা ও অস্বস্তির কথা জানান। এরপর পরিবারের সদস্যরা স্যালাইনের বোতল পরীক্ষা করে দেখেন, সেটির মেয়াদ ২০২৬ সালের মার্চেই শেষ হয়ে গিয়েছে বলে তাঁদের দাবি।
বিষয়টি নজরে আসার পর পরিবারের তরফে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। অভিযোগের গুরুত্ব বুঝে স্যালাইনটি সরিয়ে রোগিণীকে আরও নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। পরবর্তীতে তাঁকে ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে চিকিৎসা দেওয়া হয়। হাসপাতাল সূত্রে রোগিণীর অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানানো হয়েছিল। একই সঙ্গে ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত শুরু করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং স্বাস্থ্য দফতর।
তদন্তে হাসপাতালের স্টোরে ওষুধ ও স্যালাইন সংরক্ষণ, স্টক ম্যানেজমেন্ট এবং ওয়ার্ডে সরবরাহের পদ্ধতি খতিয়ে দেখা হয়। স্বাস্থ্য দফতরের প্রতিনিধিরা হাসপাতাল পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন। জেলা প্রশাসনের নির্দেশে তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। তদন্তের রিপোর্ট স্বাস্থ্য দফতরে পৌঁছনোর পর পাঁচ জনকে শোকজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপার, অ্যাডিশনাল সুপার, স্টোর ইনচার্জ, সিস্টার-ইন-চার্জ এবং এক নার্স। তাঁদের কাছ থেকে ঘটনার বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যাও চাওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে, মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া একটি স্যালাইন কীভাবে হাসপাতালের স্টোর থেকে ওয়ার্ডে পৌঁছল এবং রোগীর ব্যবহারে এল। ওষুধ বা স্যালাইন রোগীর কাছে পৌঁছনোর আগে মেয়াদ যাচাইয়ের যে প্রক্রিয়া থাকার কথা, তা ঠিকভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, সেটিই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রাথমিক তদন্তে কর্তব্যে গাফিলতির অভিযোগও উঠে এসেছে বলে একাধিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজে স্যালাইন নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রসূতি ও নবজাতকের মৃত্যুকে ঘিরে মেয়াদোত্তীর্ণ রিঙ্গার্স ল্যাক্টেট (Ringer’s Lactate) ব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছিল। সেই ঘটনার পর তদন্ত, প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং আদালত পর্যন্ত বিষয়টি গড়ায়। পরবর্তী পরীক্ষায় রাজ্যের তরফে স্যালাইনে ত্রুটি না থাকার কথাও জানানো হয়েছিল।
ফলে এক বছরের ব্যবধানে একই হাসপাতালে ফের মেয়াদোত্তীর্ণ স্যালাইন ব্যবহারের অভিযোগ সামনে আসায় হাসপাতালের নজরদারি ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে এই স্যালাইনের কারণে রোগিণীর শারীরিক সমস্যার অবনতি হয়েছে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয় এবং তদন্তের ফলাফলের উপরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে। এখন নজর স্বাস্থ্য দফতরের তদন্ত, পাঁচ জনের জবাব এবং হাসপাতালের ওষুধ সংরক্ষণ ব্যবস্থায় পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।

