কলকাতার হোটেল অগ্নিকাণ্ডে বাংলাদেশি মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭, নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে উঠছে বড় প্রশ্ন
চিকিৎসার জন্য কলকাতায় এসে মর্মান্তিক পরিণতি, হোটেল আগুনে বাংলাদেশি মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭
কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বাংলাদেশি নাগরিকদের মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে সাত হয়েছে। বুধবার, ১৯ আগস্ট ভোররাতে মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ (Shikha Inn) হোটেলে আগুন লাগে। ঘটনায় মোট নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পাঁচ বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হলেও পরে আরও দু’জনের পরিচয় শনাক্ত হওয়ায় মৃত বাংলাদেশিদের সংখ্যা সাত হয়েছে।
আগুন লাগার সময় অধিকাংশ আবাসিক ঘুমিয়ে ছিলেন। দ্রুত গোটা ভবনে ঘন ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। উদ্ধারকারীদের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় ধোঁয়ায় ভরে যাওয়া ঘর এবং সীমিত বেরোনোর পথ। দমকল বাহিনী ও উদ্ধারকারী দল অভিযান চালিয়ে প্রায় ৮০ জনকে নিরাপদে বের করে আনে। অন্তত ছ’জন আহত হয়েছেন বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
নিহত বাংলাদেশিদের মধ্যে একই পরিবারের চারজন রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশিস দত্ত, তাঁর স্ত্রী আফসানা শারমিন, তাঁদের ছোট ছেলে এবং দেবাশিসের শ্বশুর মো. আকরাম আলি। পরিবারটি চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ভারতে এসেছিল বলে বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পরে সাতক্ষীরার আরও দু’জন—এস এম আলিমুজ্জামান ও রেবতী সরকার—এর পরিচয় শনাক্ত হয়। এর ফলে বাংলাদেশি মৃতের সংখ্যা সাতের জায়গায় নিশ্চিত হয়।
অগ্নিকাণ্ডের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে হোটেলটির fire safety ব্যবস্থা নিয়ে। প্রাথমিক তদন্তে ভবনটির অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি নির্গমন ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ভবনটির কাঠামো ছিল ঘিঞ্জি এবং সেখানে একাধিক হোটেল বা গেস্টহাউস চলছিল। কিছু ঘরে পর্যাপ্ত জানালা বা নিরাপদ বিকল্প বেরোনোর ব্যবস্থা ছিল না বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।
ঘটনার তদন্তে কলকাতা পুলিশ পাঁচ সদস্যের Special Investigation Team (SIT) গঠন করেছে। ইতিমধ্যেই হোটেলের leaseholder আবু জাফরকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং আরও দু’জন হোটেলকর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। ভবনের মালিকের খোঁজ চলছে। তদন্তকারীরা হোটেল পরিচালনার নথি, লিজ ব্যবস্থা, অগ্নিনিরাপত্তা বিধি এবং সংশ্লিষ্ট অনুমোদন খতিয়ে দেখছেন।
আগুনের সঠিক কারণ এখনও চূড়ান্তভাবে জানা যায়নি। শর্ট সার্কিট-সহ একাধিক সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত দায় চাপানো ঠিক হবে না। তবে এই ঘটনায় কলকাতার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পুরনো ভবনের বাণিজ্যিক ব্যবহার এবং আবাসিক হোটেলগুলির fire-safety compliance নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
নিউ মার্কেট ও সংলগ্ন এলাকা বাংলাদেশি পর্যটক ও চিকিৎসাপ্রার্থীদের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত। ফলে নিহতদের অধিকাংশই বাংলাদেশি হওয়ায় দুই দেশের মানুষের মধ্যেই শোক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এখন তদন্তের মূল লক্ষ্য—কীভাবে আগুন ছড়াল, কেন এত দ্রুত ধোঁয়া জমল এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলে এই প্রাণহানি এড়ানো যেত কি না, তার উত্তর খুঁজে বের করা। পাশাপাশি কলকাতার অন্যান্য হোটেলেও নিরাপত্তা বিধি কতটা মানা হচ্ছে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

