পাহাড়ের চূড়ায় শত্রু, নিচ থেকে ভারতীয় সেনার লড়াই: কারগিল বিজয়ের সেই কঠিন ইতিহাস

NEWS INDIA বাংলা
0

 কারগিল যুদ্ধের সেই ৬০ দিন: টাইগার হিল থেকে টোলোলিং, কীভাবে সফল হয়েছিল ‘অপারেশন বিজয়’

Kargil War 1999-এর ইতিহাস, Operation Vijay, Tiger Hill ও Tololing পুনরুদ্ধারের লড়াই এবং ভারতীয় সেনার আত্মত্যাগের কাহিনি। জানুন ২৬ জুলাই কেন Kargil Vijay Diwas।

Kargil War 1999-এ Tiger Hill-এ ভারতীয় সেনার যুদ্ধ ও Operation Vijay-এর প্রতীকী ছবি


১৯৯৯ সালের গ্রীষ্ম। নিয়ন্ত্রণরেখা (LoC) বরাবর ভারতের কারগিল সেক্টরে সন্দেহজনক গতিবিধির খবর পেতে শুরু করে ভারতীয় সেনা। প্রথমে মনে করা হয়েছিল, হয়তো সাধারণ অনুপ্রবেশের ঘটনা। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। অনুসন্ধান ও নজরদারি বাড়তেই স্পষ্ট হয়, পাকিস্তানি সেনা ও তাদের মদতপুষ্ট অনুপ্রবেশকারীরা নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়চূড়া ও অবস্থান দখল করে বসেছে।

কারগিল যুদ্ধের সবচেয়ে বড় কৌশলগত গুরুত্ব ছিল এই পাহাড়চূড়াগুলির অবস্থান। সেখান থেকে শ্রীনগর-লেহ জাতীয় সড়কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের ওপর নজর রাখা সম্ভব ছিল। এই সড়ক দিয়েই লাদাখে মোতায়েন ভারতীয় সেনাদের জন্য অস্ত্র, গোলাবারুদ, জ্বালানি ও অন্যান্য রসদ পৌঁছত। ফলে দখল করা অবস্থানগুলি ধরে রাখতে পারলে ভারতের সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারত।

পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে ভারতীয় সেনা শুরু করে ‘অপারেশন বিজয়’ (Operation Vijay)। লক্ষ্য ছিল দখল হয়ে যাওয়া প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান পুনরুদ্ধার করা এবং নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর আগের অবস্থান ফিরিয়ে আনা।

এরপর শুরু হয় স্বাধীন ভারতের সামরিক ইতিহাসের অন্যতম কঠিন উচ্চভূমির যুদ্ধ। একদিকে ছিল খাড়া পাথুরে পাহাড়, তীব্র ঠান্ডা, কম অক্সিজেন এবং দুর্গম ভূখণ্ড। অন্যদিকে, পাকিস্তানি বাহিনী ছিল পাহাড়ের উঁচু অবস্থানে। ফলে ভারতীয় সেনাদের অনেক ক্ষেত্রেই নিচ থেকে খাড়া ঢাল বেয়ে উঠে শত্রুর অবস্থানে পৌঁছতে হয়েছে। ওপর থেকে গুলিবর্ষণের মধ্যেও এগিয়ে যেতে হয়েছে তাঁদের।

টোলোলিং, টাইগার হিল, পয়েন্ট ৪৮৭৫-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে ভারতীয় সেনারা অসাধারণ সাহসিকতার পরিচয় দেন। এই যুদ্ধে বহু জওয়ান ও অফিসার দেশের জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করেন। তাঁদের বীরত্ব ও আত্মত্যাগ কারগিল যুদ্ধের ইতিহাসে আজও বিশেষভাবে স্মরণীয়।



যুদ্ধের সময় ভারতীয় বায়ুসেনাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অপারেশন সফেদ সাগর (Operation Safed Sagar)-এর মাধ্যমে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পাকিস্তানি অবস্থানের বিরুদ্ধে বিমান অভিযান চালানো হয়। একইসঙ্গে স্থলপথে ভারতীয় সেনার অগ্রগতি অব্যাহত থাকে।

যুদ্ধ যত এগোতে থাকে, ততই আন্তর্জাতিক মহলে পাকিস্তানের ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়ে। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনী দখল করা অবস্থান থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়। ২৬ জুলাই ১৯৯৯ ভারতীয় সেনা কারগিলের অধিকাংশ দখলকৃত অবস্থান পুনরুদ্ধার করে এবং যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। সেই দিনটিকেই পরবর্তীতে কারগিল বিজয় দিবস (Kargil Vijay Diwas) হিসেবে পালন করা হয়।

প্রায় দুই মাসের এই সংঘাত শুধু পাহাড়ি ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের লড়াই ছিল না। এটি ছিল প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে ভারতীয় সেনার কৌশল, সাহস, নেতৃত্ব এবং আত্মত্যাগের এক অনন্য অধ্যায়। কারগিলের বরফঢাকা পাহাড় আজও সেই লড়াইয়ের সাক্ষী। প্রতি বছর ২৬ জুলাই দেশ স্মরণ করে সেইসব বীর সেনাকে, যাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে দেশের ভূখণ্ড সুরক্ষিত হয়েছিল।

কারগিল যুদ্ধ তাই শুধু একটি সামরিক বিজয়ের গল্প নয়। এটি ভারতের প্রতিরক্ষা ইতিহাসে সাহস ও আত্মত্যাগের এমন এক অধ্যায়, যা নতুন প্রজন্মের কাছেও দেশের প্রতি কর্তব্য ও দায়বদ্ধতার বার্তা বহন করে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!