হরমুজ নিয়ে মুখোমুখি ওয়াশিংটন-তেহরান, নিয়ন্ত্রণের দাবিতে বাড়ছে সংঘাত
‘হরমুজ আমাদের নিয়ন্ত্রণে’, পাল্টা ট্রাম্পের ‘আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ’, কার্যত থমকে তেলবাহী জাহাজ চলাচল
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস পরিবহণপথকে ঘিরে দুই দেশের পাল্টাপাল্টি দাবি এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ইরানের দাবি, হরমুজ তাদের নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার অধীনে। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও প্রণালীর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’-এর দাবি করেছেন।
ইরানের নতুন বাসিজ প্রধান হোসেইন তাইয়েব দাবি করেছেন, হরমুজ এখন পুরোপুরি ইরানের নিয়ন্ত্রণে। ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ডও জানিয়েছে, তাদের অনুমতি ছাড়া কোনও জাহাজকে প্রণালী দিয়ে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে না। তেহরানের অবস্থান, হরমুজ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার আগে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার-সহ একাধিক শর্ত পূরণ করতে হবে।
অন্যদিকে ট্রাম্প ১৩ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, হরমুজের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘total control’ রয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ দীর্ঘ সময়, এমনকি অনির্দিষ্টকাল ধরে চালিয়ে যাওয়ার মতো সামরিক সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। ওয়াশিংটন জানিয়েছে, প্রয়োজন অনুযায়ী নৌবাহিনীর জাহাজ ঘুরিয়ে এই অবরোধ বজায় রাখা সম্ভব।
এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে জাহাজ চলাচলে। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ১৩০ থেকে ১৪০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করত। কিন্তু ১২ আগস্ট ট্র্যাক করা জাহাজের সংখ্যা এক সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন আটটিতে নেমে আসে। শুক্রবারও মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি জাহাজ প্রণালী অতিক্রম করেছে, অধিকাংশ তেল পরিবহণ কার্যত বন্ধ হয়ে রয়েছে।
এর মধ্যেই ১৪ আগস্ট সংযুক্ত আরব আমিরশাহির রাষ্ট্রীয় তেল সংস্থা ADNOC-এর একটি জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করার সময় হামলার মুখে পড়ে। কোনও হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। গত এক সপ্তাহে ADNOC-এর জাহাজকে ঘিরে এটি তৃতীয় হামলার ঘটনা বলে সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। আগের ঘটনাগুলির জন্য সংযুক্ত আরব আমিরশাহী ইরানকে দায়ী করলেও সর্বশেষ ঘটনার বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে একই ধরনের দায় স্বীকারের তথ্য পাওয়া যায়নি।
হরমুজ প্রণালী বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের চালান এই জলপথের সঙ্গে যুক্ত। ফলে দীর্ঘদিন জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে তেলের দাম, পরিবহণ খরচ এবং মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। ১৪ আগস্ট আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১.৪৫ ডলার বেড়ে ৮৮.৫২ ডলারে পৌঁছয়।
ইতিমধ্যেই এশিয়ার কয়েকটি শোধনাগার মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহের বিকল্প হিসেবে মার্কিন ও অন্যান্য উৎস থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা বাড়িয়েছে। এর ফলে বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের রুটেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে।
সব মিলিয়ে, হরমুজকে ঘিরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই মুখোমুখি অবস্থান এখন আর শুধু সামরিক বা কূটনৈতিক সংঘাতের বিষয় নয়। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও বিশ্ব অর্থনীতিতে। যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার পথ এখনও অনিশ্চিত থাকায় আগামী দিনে হরমুজ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হয় কি না, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক মহলের অন্যতম বড় প্রশ্ন।

