হিন্দ রাজাবের গাড়িতে গুলি চালিয়েছিল ইসরায়েলি সেনা! ২ বছর পর স্বীকারোক্তি, শুরু ফৌজদারি তদন্ত
শেষ ফোনকলের দুই বছর পর বদলাল বয়ান, হিন্দ রাজাবের ঘটনায় ইসরায়েলি বাহিনীর নতুন স্বীকারোক্তি
গাজা যুদ্ধ ঘিরে আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় পাঁচ বছরের ফিলিস্তিনি শিশু হিন্দ রাজাবের মৃত্যু। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে গাজা সিটিতে পরিবারের সঙ্গে পালানোর সময় যে গাড়িতে হিন্দ ছিলেন, সেই গাড়িতে ইসরায়েলি সেনারা গুলি চালিয়েছিল—প্রথমবারের মতো তা স্বীকার করেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। একই সঙ্গে ঘটনায় ফৌজদারি তদন্ত (Criminal Investigation) শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে ২০২৪ সালের ২৯ জানুয়ারি। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একটি গাড়িতে করে এলাকা ছাড়ার সময় সেটি গুলির মুখে পড়ে। গাড়িতে থাকা হিন্দ ছাড়া পরিবারের অন্য ছয় সদস্য নিহত হন। গুলিবিদ্ধ গাড়ির ভিতরে আটকে থাকা হিন্দ পরে ফোনে প্যালেস্টাইন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (PRCS)-এর কাছে সাহায্য চান। তাঁকে উদ্ধারের জন্য একটি অ্যাম্বুল্যান্স পাঠানো হলেও পরে উদ্ধারকারী দলের সঙ্গেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ১২ দিন পর হিন্দ, তাঁর পরিবারের সদস্য এবং তাঁকে উদ্ধারে যাওয়া দুই প্যারামেডিকের দেহ উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার পর ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ওই এলাকায় তাদের বাহিনীর উপস্থিতি অস্বীকার করেছিল। পরবর্তী অনুসন্ধানে ঘটনাস্থলের কাছে ইসরায়েলি সাঁজোয়া যান থাকার প্রমাণ সামনে আসে। এবার ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর Fact-Finding and Assessment Mechanism-এর পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, তাদের সেনারা একটি গাড়িতে গুলি চালিয়েছিল। একই সঙ্গে প্যালেস্টাইন রেড ক্রিসেন্টের অ্যাম্বুল্যান্সের চলাচল সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও গুরুতর ব্যর্থতার কথা উঠে এসেছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই সামরিক পুলিশের Criminal Investigation Division-কে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে তদন্তের সিদ্ধান্তকে সরাসরি দোষী সাব্যস্ত হওয়া হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর বক্তব্য অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনার পর এমন কিছু তথ্য পাওয়া গেছে, যার ভিত্তিতে সম্ভাব্য অপরাধমূলক আচরণ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ফলে তদন্তের পরই জানা যাবে, সংশ্লিষ্ট সেনাদের বিরুদ্ধে বাস্তবে কী ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এই ঘটনাটির সঙ্গে ২০২৫ সালের মার্চে গাজায় ১৫ জন প্যারামেডিক ও উদ্ধারকর্মীর মৃত্যুর ঘটনাকেও ফৌজদারি তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, প্রায় ১৫০টি যুদ্ধকালীন ঘটনার পর্যালোচনার পর পাঁচটি আলোচিত ঘটনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে হিন্দ রাজাবের ঘটনা এবং ২০২৫ সালের উদ্ধারকর্মীদের মৃত্যুর ঘটনায় ফৌজদারি তদন্তের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
অন্যদিকে World Central Kitchen-এর সাতজন ত্রাণকর্মীর মৃত্যু এবং Doctors Without Borders-এর কর্মীদের মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি ঘটনায় নতুন করে ফৌজদারি তদন্ত না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
হিন্দ রাজাবের পরিবারের পক্ষ থেকেও ইসরায়েলি সামরিক তদন্ত নিয়ে আস্থার ঘাটতির কথা জানানো হয়েছে এবং স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি উঠেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলিও প্রশ্ন তুলেছে, অভিযুক্ত পক্ষের নিজস্ব ব্যবস্থায় তদন্ত কতটা স্বাধীন ও কার্যকর হতে পারে।
হিন্দ রাজাবের মৃত্যু এখন গাজা যুদ্ধে বেসামরিক নাগরিক ও চিকিৎসাকর্মীদের নিরাপত্তা এবং সামরিক জবাবদিহির বৃহত্তর বিতর্কের প্রতীক। ইসরায়েলি বাহিনীর এই নতুন স্বীকারোক্তি তাই শুধু একটি পুরনো ঘটনার পুনর্বিবেচনা নয়; এটি যুদ্ধের সময় বেসামরিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে দায় নির্ধারণ এবং আইনি জবাবদিহির প্রশ্নকেও ফের সামনে নিয়ে এসেছে। তদন্তের ফল এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই এখন নজর আন্তর্জাতিক মহলের।

