দেশের সেরা সরকারি আবাসিক বিদ্যালয়গুলির কথা উঠলেই যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম বারবার সামনে আসে, তার মধ্যে অন্যতম ঝাড়খণ্ডের নেতারহাট আবাসিক বিদ্যালয়। কয়েক দশক ধরে এই স্কুল শুধু পরীক্ষার ফল নয়, নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা এবং সর্বাঙ্গীণ শিক্ষার জন্য বিশেষ পরিচিতি তৈরি করেছে। সেই কারণেই বহু মানুষ অনানুষ্ঠানিকভাবে এই প্রতিষ্ঠানকে ‘IAS-IPS ফ্যাক্টরি’ বলেও উল্লেখ করেন।
প্রতি বছর ঝাড়খণ্ড-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের হাজার হাজার পরিবার এই বিদ্যালয়ে সন্তানকে ভর্তি করানোর স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু কী এমন বিশেষত্ব রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানে? কেন আজও এটি দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আবাসিক বিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত? জেনে নেওয়া যাক।
নেতারহাট আবাসিক বিদ্যালয়ের ইতিহাস
ঝাড়খণ্ডের লাতেহার জেলায় অবস্থিত নেতারহাট আবাসিক বিদ্যালয় স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠিত একটি ঐতিহ্যবাহী সরকারি আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিদ্যালয়টি মানসম্মত শিক্ষা, কঠোর নিয়মানুবর্তিতা এবং ছাত্রদের সার্বিক বিকাশের উপর গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। দীর্ঘ সময় ধরে এই নীতিই বিদ্যালয়ের অন্যতম পরিচয় হয়ে উঠেছে।
কেন ‘IAS-IPS ফ্যাক্টরি’ বলা হয়?
নেতারহাট বিদ্যালয়ের বহু প্রাক্তন ছাত্র ভারতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক, বৈজ্ঞানিক, চিকিৎসা, প্রকৌশল ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
বিশেষ করে ভারতীয় প্রশাসনিক পরিষেবা (IAS), ভারতীয় পুলিশ পরিষেবা (IPS) এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় বহু প্রাক্তনীর সাফল্যের কারণে বিদ্যালয়টিকে অনেকেই অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘IAS-IPS ফ্যাক্টরি’ বলে থাকেন।
তবে এই উপাধি কোনও সরকারি স্বীকৃতি নয়; এটি মূলত বিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের সাফল্যের ভিত্তিতে প্রচলিত একটি জনপ্রিয় পরিচিতি।
কীভাবে আলাদা এই বিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থা?
নেতারহাট আবাসিক বিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা শুধুমাত্র পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
এখানে শিক্ষার্থীদের—
একাডেমিক শিক্ষা
শারীরিক সক্ষমতা
সাংস্কৃতিক চর্চা
নৈতিক মূল্যবোধ
নেতৃত্বের গুণাবলি
—সমান গুরুত্ব দিয়ে গড়ে তোলা হয়।
আবাসিক পরিবেশে ছাত্ররা ছোটবেলা থেকেই আত্মনির্ভরতা, শৃঙ্খলা এবং দলগতভাবে কাজ করার অভ্যাস তৈরি করার সুযোগ পায়।
দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশংসাও পেয়েছে এই প্রতিষ্ঠান
নেতারহাট আবাসিক বিদ্যালয়ের সাফল্য অতীতেও জাতীয় স্তরে প্রশংসিত হয়েছে।
প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার মানে মুগ্ধ হয়ে দেশের অন্যত্রও একই ধরনের আবাসিক বিদ্যালয় গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
কতজন IAS-IPS তৈরি করেছে এই স্কুল?
বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়, এই বিদ্যালয়ের প্রাক্তনীদের মধ্যে হাজার হাজার শিক্ষার্থী IAS, IPS এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সিভিল সার্ভিসে নির্বাচিত হয়েছেন।
তবে প্রায় ৩,০০০ জন IAS-IPS বা সিভিল সার্ভিস কর্মকর্তা তৈরি হয়েছে—এই সংখ্যাটি বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক সূত্রে প্রচলিত হলেও তার স্বাধীন সরকারি পরিসংখ্যান সর্বসমক্ষে উপলব্ধ নয়। তাই এই তথ্যকে সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
কীভাবে ভর্তি হওয়া যায়?
নেতারহাট আবাসিক বিদ্যালয়ে ভর্তি অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক।
সাধারণভাবে ভর্তি প্রক্রিয়ার প্রধান ধাপগুলি হল—
নির্দিষ্ট সময়ে আবেদনপত্র জমা।
লিখিত প্রবেশিকা পরীক্ষা।
মেধাতালিকার ভিত্তিতে নির্বাচন।
প্রয়োজনীয় নথি যাচাইয়ের পর চূড়ান্ত ভর্তি।
প্রতিবছর ভর্তি সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করে। তাই আবেদন করার আগে সর্বশেষ সরকারি নির্দেশিকা দেখে নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কেন এখনও এত জনপ্রিয়?
ডিজিটাল যুগেও নেতারহাট আবাসিক বিদ্যালয়ের জনপ্রিয়তা কমেনি। কারণ এখানে শুধু পরীক্ষার নম্বর নয়, একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্ব, নেতৃত্বের ক্ষমতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এই কারণেই বহু অভিভাবক মনে করেন, একটি সুসংগঠিত আবাসিক পরিবেশে মানসম্মত শিক্ষা ভবিষ্যতের জন্য দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
এক নজরে নেতারহাট আবাসিক বিদ্যালয়
অবস্থান: লাতেহার জেলা, ঝাড়খণ্ড
ধরন: সরকারি আবাসিক বিদ্যালয়
বিশেষত্ব: মানসম্মত শিক্ষা, আবাসিক পরিবেশ ও শৃঙ্খলাভিত্তিক পাঠদান
পরিচিতি: বহু সফল প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও বিভিন্ন পেশার কৃতী প্রাক্তনীর জন্য সুপরিচিত
ভর্তি: প্রবেশিকা পরীক্ষার মাধ্যমে
নেতারহাট আবাসিক বিদ্যালয় শুধু একটি স্কুল নয়, বহু দশকের শিক্ষাগত ঐতিহ্যের প্রতীক। কঠোর নিয়মানুবর্তিতা, মানসম্মত শিক্ষা এবং সর্বাঙ্গীণ ব্যক্তিত্ব গঠনের উপর জোর দেওয়ার কারণেই আজও এই প্রতিষ্ঠান দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সরকারি আবাসিক বিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত। সেই কারণেই প্রতি বছর অসংখ্য ছাত্রছাত্রী এবং তাঁদের পরিবার এই প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করেন।

