দেশে ইথানল মিশ্রিত পেট্রল বা E20 ফুয়েল নিয়ে চলমান বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক মন্ত্রী নীতিন গড়করি সম্প্রতি দাবি করেন, E20 ব্যবহারের ফলে কোনও গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—এমন প্রমাণ কেউ এখনও তাঁর সামনে তুলে ধরতে পারেননি। এর পরেই আন্দোলনকারীরা মন্ত্রীর এই মন্তব্যের জবাব দিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনার আহ্বান জানান।
আন্দোলনকারীদের দাবি, তাঁদের কাছে এমন কয়েকজন গাড়ির মালিক রয়েছেন, যাঁরা E20 জ্বালানি ব্যবহারের পর নানা ধরনের যান্ত্রিক সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার অভিযোগ করেছেন। তবে এই দাবিগুলি এখনও স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
কী বলেছিলেন নীতিন গড়করি?
একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে নীতিন গড়করি বলেন, ইথানল মিশ্রিত পেট্রলের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠলেও এখনও পর্যন্ত এমন কোনও নির্দিষ্ট প্রমাণ তাঁর সামনে আসেনি, যা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে শুধুমাত্র E20 জ্বালানির কারণেই কোনও গাড়ি বিকল হয়েছে।
তিনি আরও জানান, যদি কোনও গ্রাহক মনে করেন যে E20 ব্যবহারের কারণে তাঁর গাড়ির ক্ষতি হয়েছে, তাহলে সংশ্লিষ্ট ডিলার বা সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানানো যেতে পারে। সরকার সেই অভিযোগ খতিয়ে দেখার আশ্বাসও দিয়েছে।
চ্যালেঞ্জ গ্রহণ আন্দোলনকারীদের
গড়করির বক্তব্যের পর সমাজকর্মী ও উদ্যোক্তা তহসিন পুনাওয়ালা ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে জানান, তাঁর নেতৃত্বাধীন সংগঠনের কাছে এমন কয়েকজন গাড়ির মালিক রয়েছেন, যাঁরা E20 ব্যবহারের পর সমস্যা হওয়ার দাবি করছেন।
তাঁর বক্তব্য, তাঁরা মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে প্রস্তুত। তবে সেই বৈঠক সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতিতে এবং সরাসরি সম্প্রচার হওয়া উচিত, যাতে গোটা আলোচনা সাধারণ মানুষও দেখতে পারেন।
পুনাওয়ালার দাবি, দিল্লি পুলিশের অনুমতি ছাড়া তাঁরা মন্ত্রীর বাসভবনে যেতে পারবেন না। তাই সরকার বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক সময় নির্ধারণের আবেদনও জানানো হয়েছে।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে E20 নীতি
ভারত সরকার দীর্ঘদিন ধরেই পেট্রলে ধাপে ধাপে ইথানলের মিশ্রণ বাড়ানোর নীতি অনুসরণ করছে। এই কর্মসূচির প্রধান উদ্দেশ্যগুলির মধ্যে রয়েছে—
অপরিশোধিত তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো।
পরিবেশ দূষণ হ্রাস করা।
আখ ও অন্যান্য কৃষিজ ফসলের মাধ্যমে ইথানল উৎপাদন বাড়িয়ে কৃষকদের অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ তৈরি করা।
জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করা।
২০১৮ সালের জাতীয় জৈব জ্বালানি নীতিতে ধাপে ধাপে E20 বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন দ্রুত এগিয়ে আনা হয়।
সরকার কী বলছে?
কেন্দ্রের বক্তব্য, আধুনিক E20-সামঞ্জস্যপূর্ণ ইঞ্জিনে এই জ্বালানি ব্যবহারে কোনও সমস্যা হওয়ার কথা নয়। বরং ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি ব্যবহার করলে কার্বন নিঃসরণ কমে এবং আমদানি নির্ভরতা হ্রাস পায়।
তেল বিপণন সংস্থাগুলিও জানিয়েছে, নতুন প্রজন্মের অনেক গাড়িই E20 ব্যবহারের উপযোগী করে তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন নির্মাতা সংস্থাও ধাপে ধাপে E20-সামঞ্জস্যপূর্ণ মডেল বাজারে আনছে।
গ্রাহকদের একাংশের উদ্বেগ কোথায়?
অন্যদিকে, কিছু গাড়ি ব্যবহারকারী এবং আন্দোলনকারীদের দাবি, বিশেষ করে পুরনো মডেলের গাড়িতে E20 ব্যবহারের পর মাইলেজ কমে যাওয়া, ইঞ্জিনের কর্মক্ষমতা হ্রাস বা ফুয়েল সিস্টেমে সমস্যা দেখা দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
তবে এই অভিযোগগুলির ক্ষেত্রে প্রতিটি ঘটনার প্রকৃত কারণ পৃথকভাবে প্রযুক্তিগত পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হয়। শুধুমাত্র জ্বালানির কারণে সমস্যা হয়েছে কি না, তা প্রতিটি ক্ষেত্রে আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
অটোমোবাইল বিশেষজ্ঞদের মতে, E20 নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার—সব গাড়ি একই প্রযুক্তিতে তৈরি নয়।
যেসব গাড়ি নির্মাতা সংস্থা তাদের নির্দিষ্ট মডেলকে E20-সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে ঘোষণা করেছে, সেখানে প্রস্তুতকারকের নির্দেশিকা অনুসরণ করাই উচিত। অন্যদিকে, পুরনো গাড়ির ক্ষেত্রে মালিকদের গাড়ির ম্যানুয়াল বা অনুমোদিত সার্ভিস সেন্টারের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও জ্বালানি নিয়ে সাধারণ সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা, প্রস্তুতকারকের সুপারিশ এবং সরকারি তথ্য—সবকিছুকেই গুরুত্ব দিতে হবে।
স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগও আলোচনায়
আন্দোলনকারীদের একাংশ নীতিন গড়করির পরিবারের ব্যবসায়িক স্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে মন্ত্রী এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তাঁর ব্যক্তিগত অংশীদারিত্ব অত্যন্ত সীমিত এবং ইথানল নীতি থেকে তাঁর কোনও ব্যক্তিগত লাভের প্রশ্ন ওঠে না।
এই অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে স্বাধীনভাবে কোনও সরকারি তদন্ত বা আদালতের পর্যবেক্ষণ এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
সাধারণ মানুষের জন্য কী গুরুত্বপূর্ণ?
E20 বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—গ্রাহকদের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া। কোনও গাড়িতে কোন ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করা নিরাপদ, তা সংশ্লিষ্ট নির্মাতা সংস্থার নির্দেশিকা অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত।
যদি কোনও গাড়ির মালিক জ্বালানি ব্যবহারের পর প্রযুক্তিগত সমস্যার মুখোমুখি হন, তাহলে অনুমোদিত সার্ভিস সেন্টারে পরীক্ষা করিয়ে প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি বা সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানানোই সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।
এখন নজর পরবর্তী পদক্ষেপে
আন্দোলনকারীদের প্রকাশ্য বৈঠকের প্রস্তাবে সরকার বা কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর পক্ষ থেকে নতুন কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনও সামনে আসেনি। ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে সরাসরি আলোচনা আদৌ হয় কি না, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহল, গাড়ি ব্যবহারকারী এবং শিল্প বিশেষজ্ঞদের।
E20 জ্বালানি নিয়ে বিতর্কের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে তথ্যভিত্তিক পরীক্ষা, প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন এবং সরকারি সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশ।

