বীরভূমের অন্যতম জনপ্রিয় তীর্থক্ষেত্র তারাপীঠ মন্দিরে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তনের পথে হাঁটছে নবগঠিত মন্দির কমিটি। ভক্তদের দেওয়া দান এবং বিভিন্ন তহবিলের অর্থ সংরক্ষণ ও ব্যবহারে আরও স্বচ্ছতা আনতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মন্দির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এবার থেকে প্রতিদিন সংগৃহীত দানের অর্থ সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ব্যাঙ্কে জমা করা হবে। একই সঙ্গে ধাপে ধাপে সমস্ত আর্থিক লেনদেনকে ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনাও শুরু হয়েছে।
মন্দির কমিটির দাবি, নতুন এই ব্যবস্থা চালু হলে আর্থিক লেনদেনের প্রতিটি ধাপ নথিভুক্ত থাকবে এবং ভবিষ্যতে হিসাব সংক্রান্ত বিভ্রান্তি বা বিতর্কের সম্ভাবনাও অনেকটাই কমবে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কেন নেওয়া হল এই সিদ্ধান্ত?
সাম্প্রতিক সময়ে তারাপীঠ মন্দিরের দানের অর্থ নিয়মিত ব্যাঙ্কে জমা না হওয়া নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছিল। এরই মধ্যে কয়েক দিন আগে একসঙ্গে প্রায় আড়াই কোটি টাকা মন্দির কমিটির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা পড়ার ঘটনা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে।
এরপরই নবগঠিত মন্দির কমিটি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নতুন নীতি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। কমিটির বক্তব্য, ভবিষ্যতে প্রতিদিনের আয় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই ব্যাঙ্কে জমা করা হবে এবং প্রতিটি লেনদেনের স্পষ্ট রেকর্ড সংরক্ষণ করা হবে।
২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ব্যাঙ্কে জমা হবে দানের অর্থ
মন্দির কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিদিন মন্দিরে যে দান সংগ্রহ হবে, তা সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা করতে হবে। যদি কোনও কারণে ব্যাঙ্ক বন্ধ থাকে, তবে পরবর্তী কর্মদিবসেই সেই অর্থ জমা দেওয়া হবে।
এই ব্যবস্থার ফলে দীর্ঘ সময় নগদ অর্থ সংরক্ষণের প্রয়োজন কমবে। একই সঙ্গে দানের অর্থের প্রবাহ নিয়মিতভাবে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার মধ্যে চলে আসবে, যা আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।
প্রতিটি তহবিলের জন্য থাকবে আলাদা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট
মন্দির পরিচালনার বিভিন্ন খাতে আলাদা আলাদা তহবিল ব্যবহৃত হয়। সেই কারণে প্রতিটি তহবিলের অর্থ পৃথক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে রাখা হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এর ফলে কোন খাতে কত অর্থ জমা হচ্ছে, কত টাকা ব্যয় হচ্ছে এবং কত অর্থ অবশিষ্ট রয়েছে—সবকিছুর পৃথক হিসাব রাখা সহজ হবে। ভবিষ্যতে অডিট বা প্রশাসনিক পর্যালোচনার ক্ষেত্রেও এই ব্যবস্থা কার্যকর হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ডিজিটাল লেনদেনের পথে তারাপীঠ মন্দির
নতুন সিদ্ধান্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থাপনা।
মন্দির কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ধাপে ধাপে সমস্ত হিসাবরক্ষণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তর করা হবে। বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন শুধুমাত্র ব্যাঙ্কিং চ্যানেলের মাধ্যমে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। দৈনন্দিন ছোটখাটো খরচ নগদে করা হলেও বড় ব্যয় চেক বা অনুমোদিত ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার মাধ্যমে করা হবে।
এর ফলে প্রতিটি আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছ নথি সংরক্ষিত থাকবে এবং প্রয়োজনে তা সহজেই যাচাই করা সম্ভব হবে।
ডিজিটাল হিসাবরক্ষণের জন্য নিয়োগ হবে নতুন কর্মী
ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থাপনা চালু করতে প্রয়োজন দক্ষ জনবল। সেই কারণে নতুন কর্মী নিয়োগের সিদ্ধান্তও নিয়েছে মন্দির কমিটি।
এই কর্মীদের দায়িত্ব হবে ডিজিটাল হিসাবরক্ষণ, ব্যাঙ্ক লেনদেনের তথ্য সংরক্ষণ, তহবিলের রেকর্ড আপডেট এবং আর্থিক নথিপত্র সঠিকভাবে পরিচালনা করা।
কমিটির মতে, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার প্রশাসনিক কাজকে আরও দ্রুত ও নির্ভুল করবে।
অসমাপ্ত অফিস নির্মাণের কাজও শুরু হবে
আর্থিক সংস্কারের পাশাপাশি মন্দির প্রশাসনের পরিকাঠামো উন্নয়নের দিকেও জোর দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে অসমাপ্ত অবস্থায় থাকা মন্দির কমিটির অফিস নির্মাণের কাজ দ্রুত শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নতুন অফিস চালু হলে প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও সুসংগঠিতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে কমিটি।
বর্তমানে কতগুলি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট রয়েছে?
মন্দির সূত্রে জানা গিয়েছে, বর্তমানে তারাপীঠ মন্দিরের বিভিন্ন তহবিল পরিচালনার জন্য মোট পাঁচটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট রয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিটি অ্যাকাউন্ট নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে এবং প্রতিটি তহবিলের অর্থ পৃথকভাবে সংরক্ষণ করা হবে। এতে হিসাবপত্র আরও সুসংহত হবে এবং ভবিষ্যতে কোনও ধরনের বিভ্রান্তির সুযোগ কমবে।
নতুন কমিটির উদ্যোগে প্রশাসনিক সংস্কার
রাজ্যে প্রশাসনিক পরিবর্তনের পর তারাপীঠ মন্দিরে নতুন পরিচালন কমিটি গঠিত হয়েছে। নতুন কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই আর্থিক শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে যে কয়েকটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া কার্যকরভাবে অনুসরণ করা হচ্ছিল না, সেগুলিকে পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নিয়মিত ব্যাঙ্কে অর্থ জমা, ডিজিটাল হিসাবরক্ষণ এবং নথিভুক্ত আর্থিক ব্যবস্থাপনাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কমিটির সম্পাদক কী জানিয়েছেন?
মন্দির কমিটির সম্পাদক পুলক চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, প্রতিদিনের আয় ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ব্যাঙ্কে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ব্যাঙ্ক বন্ধ থাকলে পরবর্তী কর্মদিবসে সেই অর্থ জমা করা হবে।
তিনি আরও জানান, বিভিন্ন তহবিলের জন্য পৃথক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হবে এবং আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই ডিজিটাল ব্যাঙ্কিং প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে চালু করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে ডিজিটাল হিসাবরক্ষণ পরিচালনার জন্য নতুন কর্মী নিয়োগ এবং প্রশাসনিক পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।
ভক্তদের জন্য এর গুরুত্ব কী?
তারাপীঠে প্রতিদিন হাজার হাজার ভক্ত পুজো দিতে আসেন এবং দান করেন। ফলে মন্দিরের আর্থিক লেনদেনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনা থাকলে ভক্তদের আস্থা আরও বাড়ে। নিয়মিত ব্যাঙ্কে অর্থ জমা, ডিজিটাল হিসাবরক্ষণ এবং নথিভুক্ত ব্যয়ের ব্যবস্থা ভবিষ্যতে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
নতুন ব্যবস্থাগুলি সম্পূর্ণভাবে কার্যকর হলে তারাপীঠ মন্দিরের আর্থিক পরিচালনায় আরও স্বচ্ছ, আধুনিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর কাঠামো গড়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।

