বর্ষায় মাঝরাস্তায় বাইক বন্ধ? এই ৬ কাজ করলেই বাঁচবে ইঞ্জিন

NEWS INDIA বাংলা
0
Monsoon bike maintenance tips motorcycle service rainy season


বর্ষাকাল মানেই একদিকে প্রকৃতির নতুন রূপ, অন্যদিকে বাইক বা স্কুটিতে যাতায়াত করা মানুষদের জন্য একগুচ্ছ নতুন সমস্যা। অফিস, কলেজ কিংবা জরুরি কাজে প্রতিদিন যাঁরা মোটরসাইকেলের উপর নির্ভর করেন, তাঁদের কাছে টানা বৃষ্টি অনেক সময়ই দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।


কলকাতা-সহ দেশের বহু শহরে বর্ষা এলেই জল জমা রাস্তা, কাদা, পিচ্ছিল পথ এবং যানজট প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা। এর সঙ্গে যোগ হয় আরেকটি বড় সমস্যা—মাঝরাস্তায় হঠাৎ বাইক স্টার্ট না নেওয়া, ইঞ্জিনে জল ঢুকে যাওয়া, ব্রেক ঠিকমতো কাজ না করা কিংবা চেনে মরচে ধরা। অনেকেই ভাবেন এগুলো শুধুই দুর্ভাগ্য, কিন্তু বাস্তবে এর বেশিরভাগ সমস্যাই সামান্য কিছু প্রস্তুতি নিলেই এড়ানো সম্ভব।


বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই যদি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খেয়াল রাখা যায়, তাহলে শুধু বাইকের আয়ুই বাড়বে না, অপ্রয়োজনীয় সার্ভিসিং খরচ থেকেও অনেকটাই রেহাই মিলবে।


১. বর্ষার আগে সম্পূর্ণ সার্ভিসিং করিয়ে নিন

বাইকের নিয়মিত সার্ভিসিং শুধু পারফরম্যান্স বাড়ায় না, বড় ধরনের যান্ত্রিক সমস্যাও আগেভাগে ধরা পড়ে।


বিশেষ করে বর্ষার আগে ইঞ্জিন অয়েল, এয়ার ফিল্টার, স্পার্ক প্লাগ, ব্যাটারি, ক্লাচ, ব্রেক এবং ইলেকট্রিক্যাল সংযোগগুলো ভালোভাবে পরীক্ষা করানো উচিত। কোথাও কোনও ছোটখাটো ত্রুটি থাকলে সেটি আগে থেকেই মেরামত করলে বর্ষার মধ্যে বিপাকে পড়ার সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়।


২. স্পার্ক প্লাগ ও ইলেকট্রিক্যাল অংশে বিশেষ নজর দিন

বর্ষাকালে সবচেয়ে বেশি সমস্যার মধ্যে অন্যতম হলো স্পার্ক প্লাগে জল ঢুকে যাওয়া।


স্পার্ক প্লাগ ভিজে গেলে ইঞ্জিন ঠিকমতো স্পার্ক তৈরি করতে পারে না। ফলে বাইক স্টার্ট নিতে দেরি করে, কখনও আবার সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।


যদি স্পার্ক প্লাগ অনেক দিনের পুরনো হয়ে থাকে বা তার কার্যক্ষমতা কমে গিয়ে থাকে, তাহলে বর্ষার আগেই সেটি বদলে ফেলা বুদ্ধিমানের কাজ। পাশাপাশি ইগনিশন ওয়্যার, ফিউজ এবং অন্যান্য ইলেকট্রিক্যাল কানেকশনও পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া উচিত।


৩. ফুয়েল ট্যাঙ্কের ঢাকনা ও সিলিং পরীক্ষা করুন

অনেকেই এই বিষয়টি গুরুত্ব দেন না, অথচ বর্ষায় এটি বড় সমস্যার কারণ হতে পারে।


যদি পেট্রোল ট্যাঙ্কের ঢাকনা ঠিকমতো বন্ধ না থাকে অথবা রাবারের সিল ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়, তাহলে বৃষ্টির জল ট্যাঙ্কের ভিতরে ঢুকে যেতে পারে।


জ্বালানির সঙ্গে জল মিশে গেলে ইঞ্জিনের পারফরম্যান্স কমে যায়, মাইলেজও হ্রাস পায়। এমনকি দীর্ঘদিন এই সমস্যা চলতে থাকলে ফুয়েল ইনজেকশন বা কার্বুরেটরেও ক্ষতি হতে পারে।


তাই বর্ষা শুরুর আগে ট্যাঙ্কের ঢাকনা এবং রাবার সিল অবশ্যই পরীক্ষা করে নিন।


৪. ব্যাটারি ও লক সিস্টেমের যত্ন নিন

বৃষ্টির জলে বাইকের ব্যাটারির টার্মিনালে মরচে ধরতে পারে। এর ফলে বিদ্যুৎ প্রবাহে সমস্যা দেখা দেয় এবং স্টার্টিং সমস্যাও তৈরি হতে পারে।


তাই সময় সময় ব্যাটারির টার্মিনাল পরিষ্কার রাখুন এবং প্রয়োজন হলে অ্যান্টি-করোশন গ্রিজ ব্যবহার করুন।


একইভাবে ইগনিশন কী-হোলে জল ঢুকলে সেটিও ধীরে ধীরে মরচে ধরে যেতে পারে। মাঝে মাঝে সামান্য লুব্রিকেন্ট বা গ্রিজ ব্যবহার করলে লক সিস্টেম দীর্ঘদিন ভালো থাকে।


৫. টায়ার ও ব্রেক ভালোভাবে পরীক্ষা করুন

বর্ষাকালে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হলো ক্ষয়প্রাপ্ত টায়ার।


টায়ারের ট্রেড কমে গেলে ভেজা রাস্তায় গ্রিপ কমে যায়, ফলে ব্রেক করলেও বাইক পিছলে যেতে পারে।


তাই টায়ারের অবস্থা ভালোভাবে দেখে নিন। প্রয়োজন হলে নতুন টায়ার লাগান। পাশাপাশি ব্রেক শু, ডিস্ক ব্রেক, ব্রেক ফ্লুইড এবং ব্রেক কেবলের অবস্থাও পরীক্ষা করানো জরুরি।


মনে রাখবেন, ভালো ব্রেক শুধু বাইক নয়, চালকের জীবনও সুরক্ষিত রাখে।


৬. চেন পরিষ্কার ও লুব্রিকেট করা খুবই জরুরি

বর্ষায় কাদা ও জল সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে বাইকের চেনের উপর।


নিয়মিত পরিষ্কার না করলে চেনে মরচে ধরে, ঘর্ষণ বেড়ে যায় এবং বাইকের পারফরম্যান্স কমে যায়। দীর্ঘদিন অবহেলা করলে চেন ও স্প্রকেট দ্রুত ক্ষয়ে যেতে পারে।


তাই নির্দিষ্ট সময় অন্তর চেন পরিষ্কার করে ভালো মানের চেন লুব্রিকেন্ট ব্যবহার করুন। এতে বাইকের গতি মসৃণ থাকবে এবং যন্ত্রাংশও দীর্ঘদিন ভালো থাকবে।




বর্ষাকালে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা



শুধু সার্ভিসিং করলেই দায়িত্ব শেষ নয়। প্রতিদিনের কিছু ছোট অভ্যাসও বাইককে ভালো রাখতে সাহায্য করে। যেমন—


সম্ভব হলে বাইক সবসময় ছাউনির নিচে রাখুন।

দীর্ঘ সময় বৃষ্টির মধ্যে বাইক ফেলে রাখবেন না।

ভালো মানের ওয়াটারপ্রুফ বাইক কভার ব্যবহার করুন।

জল জমা রাস্তায় অযথা দ্রুতগতিতে বাইক চালাবেন না।

গভীর জল পেরিয়ে আসার পর সঙ্গে সঙ্গে বাইক বন্ধ বা স্টার্ট করার চেষ্টা না করে প্রথমে বাইকটি শুকনো জায়গায় নিয়ে পরীক্ষা করুন।

যদি সন্দেহ হয় ইঞ্জিনে জল ঢুকেছে, তাহলে জোর করে স্টার্ট দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। এতে ইঞ্জিনের বড় ক্ষতি হতে পারে।

বর্ষার আগে সামান্য যত্নই বাঁচাতে পারে বড় খরচ

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষাকালে বাইকের যেসব সমস্যা দেখা দেয়, তার বেশিরভাগই আগে থেকে সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ করলে এড়ানো সম্ভব। কয়েকশো টাকার প্রতিরোধমূলক সার্ভিসিং অনেক সময় কয়েক হাজার টাকার ইঞ্জিন মেরামতের খরচ বাঁচিয়ে দিতে পারে। যাঁরা প্রতিদিন অফিস, ব্যবসা বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন, তাঁদের জন্য বর্ষার আগে এই প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।



বর্ষা যেমন প্রকৃতিকে নতুন প্রাণ দেয়, তেমনই বাইকের জন্য নিয়ে আসে অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ। তাই মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই যদি প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ করে রাখা যায়, তাহলে মাঝরাস্তায় বাইক বিকল হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যাবে। নিরাপদে যাতায়াতের পাশাপাশি বাইকের আয়ুও বাড়বে, আর অপ্রত্যাশিত খরচ থেকেও মিলবে মুক্তি। একটু সচেতনতাই হতে পারে আপনার সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!