নতুন বছরে ভারতীয় রেলে সবুজ বিপ্লব! আসছে হাইড্রোজেন ট্রেন

NEWS INDIA বাংলা
0
Hydrogen train Indian Railways green energy eco friendly transport


ভারতীয় রেলকে আরও আধুনিক, দ্রুত এবং পরিবেশবান্ধব করে তোলার লক্ষ্যে একের পর এক বড় পদক্ষেপ নিচ্ছে কেন্দ্র। বন্দে ভারত, অমৃত ভারত এবং সেমি-হাইস্পিড রেল পরিষেবার সাফল্যের পর এবার নজর সম্পূর্ণ নতুন এক প্রযুক্তির দিকে—হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল চালিত ট্রেন। দূষণ কমানো, জ্বালানির আমদানি নির্ভরতা হ্রাস করা এবং ভবিষ্যতের টেকসই পরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যেই ভারতীয় রেল এই নতুন প্রযুক্তিকে বাস্তবে রূপ দিতে উদ্যোগী হয়েছে।


বিশ্বের উন্নত দেশগুলির পথ অনুসরণ করে ভারতও এখন সবুজ শক্তির উপর জোর দিচ্ছে। সেই কারণেই আগামী দিনে দেশের রেল পরিষেবায় হাইড্রোজেন ট্রেন একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হতে চলেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই প্রকল্প সফল হলে শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়নই নয়, পরিবেশ সংরক্ষণেও ভারতের বড় ভূমিকা থাকবে।



কী এই হাইড্রোজেন ট্রেন?


সাধারণ ডিজেল বা বৈদ্যুতিক ট্রেনের তুলনায় হাইড্রোজেন ট্রেন সম্পূর্ণ আলাদা প্রযুক্তিতে চলে। এই ট্রেনে থাকে হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল, যেখানে হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেনের রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। সেই বিদ্যুৎ দিয়েই ট্রেনের মোটর চালিত হয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হল, এই প্রক্রিয়ায় কার্বন ডাই-অক্সাইড বা ক্ষতিকর ধোঁয়া নির্গত হয় না। এর পরিবর্তে নির্গত হয় শুধুমাত্র জল ও জলীয় বাষ্প। ফলে পরিবেশ দূষণ অনেকটাই কমে যায় এবং কার্বন নির্গমন হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এই প্রযুক্তি।


ভারতের প্রথম হাইড্রোজেন ট্রেন কোথায় চলবে?


ভারতীয় রেলের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের প্রথম হাইড্রোজেন ট্রেন হরিয়ানার সোনেপত (Sonipat) থেকে জিন্দ (Jind) রুটে পরীক্ষামূলকভাবে চালানো হবে। প্রায় ৮৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রুটকে বেছে নেওয়া হয়েছে নতুন প্রযুক্তির কার্যকারিতা যাচাইয়ের জন্য। প্রাথমিকভাবে ট্রেনে ৬ থেকে ৮টি কোচ থাকতে পারে এবং সর্বোচ্চ ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার গতিতে চলার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। যদিও প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপ ও পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে এই পরিষেবা আরও বিস্তৃত হতে পারে।



কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রযুক্তি?


বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন এবং দূষণ কমানোর লক্ষ্যে পরিবহণ ব্যবস্থায় বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ভারতও সেই লক্ষ্যেই এগোচ্ছে।

হাইড্রোজেন ট্রেন চালুর সম্ভাব্য কয়েকটি বড় সুবিধা হল—


ডিজেলের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।

কার্বন নির্গমন কমিয়ে পরিবেশ সংরক্ষণে সাহায্য করবে।

শব্দ দূষণ তুলনামূলকভাবে কম হবে।

দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ভবিষ্যতের সবুজ পরিবহণ ব্যবস্থার ভিত্তি শক্তিশালী হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি থেকে উৎপাদিত ‘গ্রিন হাইড্রোজেন’-এর ব্যবহার বাড়লে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তাও আরও মজবুত হবে।



বিশ্বের কোন কোন দেশে চলছে হাইড্রোজেন ট্রেন?


হাইড্রোজেন ট্রেন প্রযুক্তির ক্ষেত্রে জার্মানি পথপ্রদর্শক হিসেবে পরিচিত। সেখানে ইতিমধ্যেই যাত্রীবাহী হাইড্রোজেন ট্রেন বাণিজ্যিকভাবে চলাচল করছে। এই ট্রেনগুলি দীর্ঘদিন ধরে সফলভাবে পরিষেবা দিচ্ছে এবং বছরে বিপুল পরিমাণ ডিজেল সাশ্রয় করছে। জার্মানির পাশাপাশি ইতালি, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক, যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং ফ্রান্স-সহ একাধিক দেশও এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে ভারত এই তালিকায় যুক্ত হলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি হবে।



কীভাবে কাজ করে হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল?



হাইড্রোজেন ট্রেনের মূল শক্তির উৎস হল ফুয়েল সেল। এতে সংরক্ষিত হাইড্রোজেন গ্যাস অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে। সেই বিদ্যুৎ সরাসরি ট্রেনের মোটর চালায়।

ট্রেনে সাধারণত অতিরিক্ত শক্তি সংরক্ষণের জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যাটারিও ব্যবহার করা হয়। ব্রেক করার সময় উৎপন্ন শক্তির একটি অংশ পুনরায় ব্যাটারিতে জমা রাখা যায়, ফলে শক্তির অপচয় কম হয় এবং সামগ্রিক দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। একবার সম্পূর্ণ ট্যাঙ্ক ভর্তি থাকলে একটি হাইড্রোজেন ট্রেন প্রায় ১,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত চলতে সক্ষম হতে পারে বলে আন্তর্জাতিক প্রকল্পগুলির অভিজ্ঞতা জানাচ্ছে।



ভারতীয় রেলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা


ভারতীয় রেল ইতিমধ্যেই বিদ্যুতায়ন, আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা, উচ্চগতির করিডর এবং উন্নত ট্র্যাক প্রযুক্তির উপর জোর দিচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় হাইড্রোজেন ট্রেন ভবিষ্যতের একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চল, পর্যটন কেন্দ্র এবং যেসব রুটে সম্পূর্ণ বিদ্যুতায়ন করা কঠিন, সেখানে হাইড্রোজেন ট্রেন কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। এতে যাত্রী পরিষেবার মান যেমন বাড়বে, তেমনই পরিবেশের ওপর চাপও অনেকটাই কমবে।



ভবিষ্যতের পথে সবুজ রেল


হাইড্রোজেন ট্রেন শুধু একটি নতুন প্রযুক্তি নয়, বরং ভবিষ্যতের পরিবহণ ব্যবস্থার দিকনির্দেশও বটে। দূষণমুক্ত, শক্তি-সাশ্রয়ী এবং আধুনিক রেলব্যবস্থা গড়ে তুলতে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। যদিও প্রকল্পটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে এবং পরীক্ষামূলক পরিষেবার ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবুও বলা যায়—ভারতীয় রেল এখন এমন এক নতুন যুগে প্রবেশ করতে চলেছে, যেখানে উন্নত প্রযুক্তির পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণও সমান গুরুত্ব পাবে। আগামী কয়েক বছরে হাইড্রোজেন ট্রেন দেশের রেল মানচিত্রে নতুন ইতিহাস লিখতে পারে বলেই আশা করা হচ্ছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!