অ্যাপ-ভিত্তিক ট্যাক্সি পরিষেবার দুনিয়ায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিল কেন্দ্র। ওলা-উবারের একচেটিয়া আধিপত্যের মধ্যে এবার দেশের বিভিন্ন শহরে চালু হতে চলেছে নতুন রাইড-হেলিং প্ল্যাটফর্ম ‘ভারত ট্যাক্সি’ (Bharat Taxi)। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জানিয়েছেন, আগামী দু’বছরের মধ্যে দেশের ৫০০-রও বেশি শহরে এই পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া হবে। সেই তালিকায় রয়েছে কলকাতাও।
এই ঘোষণার পর থেকেই পরিবহণ মহল থেকে সাধারণ যাত্রী—সকলের মধ্যেই শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। কারণ, নতুন এই পরিষেবার মূল লক্ষ্য শুধু নতুন একটি ট্যাক্সি অ্যাপ চালু করা নয়; বরং চালকদের আর্থিক স্বনির্ভরতা বাড়ানো, যাত্রীদের কম খরচে নিরাপদ পরিষেবা দেওয়া এবং অ্যাপ-ভিত্তিক ট্যাক্সি বাজারে নতুন প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করা।
গুজরাটের গান্ধীনগর থেকে ১৪টি শহরে ‘ভারত ট্যাক্সি’ পরিষেবার উদ্বোধন করতে গিয়ে অমিত শাহ জানান, দ্বিতীয় পর্যায়ে কলকাতা, মুম্বই, পুণে, নাগপুর, লখনউ, জয়পুর, চণ্ডীগড়-সহ আরও বহু শহরে এই পরিষেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী দুই বছরের মধ্যেই ধাপে ধাপে ৫০০-রও বেশি শহরে এই নেটওয়ার্ক বিস্তার করা হবে বলে কেন্দ্রের আশা।
যদিও কলকাতায় পরিষেবা শুরুর নির্দিষ্ট দিন এখনও ঘোষণা করা হয়নি, তবে সরকারি পরিকল্পনায় শহরের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় বিষয়টি ইতিমধ্যেই তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
‘ভারত ট্যাক্সি’ একটি সমবায়ভিত্তিক (Cooperative Model) রাইড-হেলিং প্ল্যাটফর্ম, যেখানে চালকরাই শুধু পরিষেবা প্রদানকারী নন, তাঁরা এই সংস্থার অংশীদারও। অর্থাৎ প্রচলিত বেসরকারি অ্যাপ-ভিত্তিক ট্যাক্সি পরিষেবার মতো এখানে কোনও কর্পোরেট সংস্থা মোটা কমিশন কেটে নেয় না।
এই পরিষেবার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ‘জিরো কমিশন মডেল’। যাত্রী যে ভাড়া দেবেন, তার প্রায় সম্পূর্ণ অংশই চালকের কাছে পৌঁছবে। ফলে চালকদের আয় বাড়বে এবং একই সঙ্গে যাত্রীদের জন্যও তুলনামূলকভাবে কম ভাড়ায় পরিষেবা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
বর্তমানে বিভিন্ন অ্যাপ-ভিত্তিক ট্যাক্সি সংস্থায় চালকদের আয়ের একটি বড় অংশ কমিশন হিসেবে কেটে নেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরেই এই বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছেন বহু চালক।
‘ভারত ট্যাক্সি’ সেই সমস্যারই বিকল্প হিসেবে সামনে এসেছে। এখানে চালকদের ‘ড্রাইভার’ নয়, ‘সারথি’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। শুধু নামের পরিবর্তন নয়, তাঁদের মালিকানার অংশও দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ১০০ টাকার একটি শেয়ার কিনে ইতিমধ্যেই দেশের সাত লক্ষেরও বেশি চালক এই সমবায় ব্যবস্থার অংশীদার হয়েছেন। ফলে তাঁরা শুধু পরিষেবা দিচ্ছেন না, সংস্থার ভবিষ্যৎ উন্নয়নেও অংশ নিচ্ছেন।
এই নতুন পরিষেবা চালু হলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারেন সাধারণ যাত্রীরা।
সম্ভাব্য সুবিধাগুলির মধ্যে রয়েছে—
তুলনামূলকভাবে কম ভাড়া।
স্বচ্ছ ভাড়া নির্ধারণ ব্যবস্থা।
নিরাপদ ও প্রযুক্তিনির্ভর বুকিং।
চালকদের সঙ্গে সরাসরি পরিষেবা সম্পর্ক।
অতিরিক্ত সার্জ প্রাইসিংয়ের সম্ভাবনা কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন প্রতিযোগী বাজারে প্রবেশ করলে অন্যান্য অ্যাপ-ভিত্তিক সংস্থাও ভাড়া কমাতে বাধ্য হতে পারে। ফলে শেষ পর্যন্ত লাভ হবে সাধারণ গ্রাহকদেরই।
‘ভারত ট্যাক্সি’ শুধু কমিশনমুক্ত প্ল্যাটফর্মেই সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে এই পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত সারথিদের জন্য একাধিক কল্যাণমূলক প্রকল্পও চালু করা হবে।
তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
স্বল্প সুদে ঋণের সুবিধা।
পরিবারের জন্য বিমা কভার।
ব্যবসা সম্প্রসারণে আর্থিক সহায়তা।
সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় আনার উদ্যোগ।
দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতা গড়ে তোলার পরিকল্পনা।
ফলে এটি শুধুমাত্র একটি ট্যাক্সি বুকিং অ্যাপ নয়, বরং চালকদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি নতুন মডেল হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অমিত শাহ দাবি করেন, যেখানেই ‘ভারত ট্যাক্সি’ পরিষেবা চালু হয়েছে, সেখানেই প্রতিযোগী সংস্থাগুলি দ্রুত নিজেদের ভাড়া কমাতে শুরু করেছে। তাঁর বক্তব্য, নতুন পরিষেবার লক্ষ্য কোনও সংস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা নয়, বরং যাত্রীদের কম খরচে পরিষেবা দেওয়া এবং চালকদের ন্যায্য আয় নিশ্চিত করা।
তিনি আরও বলেন, বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকলে শেষ পর্যন্ত লাভবান হন সাধারণ মানুষ। একই সঙ্গে চালকদের ওপর অতিরিক্ত কমিশনের চাপও কমে।
কলকাতা এমন একটি শহর, যেখানে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং বিভিন্ন কাজে অ্যাপ-ভিত্তিক ট্যাক্সির উপর নির্ভর করেন।
যদি ‘ভারত ট্যাক্সি’ সফলভাবে চালু হয়, তাহলে কয়েকটি বড় পরিবর্তন দেখা যেতে পারে—
যাত্রীদের জন্য আরও সাশ্রয়ী ভাড়া।
চালকদের হাতে বেশি আয় পৌঁছনো।
বাজারে স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়া।
অ্যাপ-ভিত্তিক পরিষেবার মানোন্নয়ন।
গ্রাহক পরিষেবায় নতুন উদ্ভাবন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন পরিষেবা কার্যকরভাবে পরিচালিত হলে ভবিষ্যতে শহরের পরিবহণ ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে উঠে আসতে পারে ‘ভারত ট্যাক্সি’।
এখনও কলকাতায় পরিষেবা চালুর নির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশ হয়নি। তবে কেন্দ্রীয় সরকারের ঘোষণার পর স্পষ্ট যে আগামী দুই বছরের মধ্যে এই শহরেও ‘ভারত ট্যাক্সি’ পৌঁছনোর সম্ভাবনা প্রবল।
যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে একদিকে যেমন যাত্রীদের যাতায়াত আরও সাশ্রয়ী হতে পারে, অন্যদিকে হাজার হাজার চালকের আয় ও সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। সব মিলিয়ে ভারতের অ্যাপ-ভিত্তিক ট্যাক্সি পরিষেবার বাজারে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে বলেই মনে করছেন পরিবহণ বিশেষজ্ঞরা।

