অনন্ত আম্বানির চুল দান ঘিরে আলোচনায় তিরুপতি, কেন ভক্তরা মাথার চুল উৎসর্গ করেন?

NEWS INDIA বাংলা
0
Anant Ambani hair donation Tirupati Venkateswara temple tradition


দেশের অন্যতম ধনী শিল্পপতি পরিবারের সদস্য হলেও ধর্মীয় আচার পালনের ক্ষেত্রে কোনও ব্যতিক্রম দেখা গেল না অনন্ত আম্বানির ক্ষেত্রে। সম্প্রতি অন্ধ্রপ্রদেশের তিরুমালায় অবস্থিত শ্রী ভেঙ্কটেশ্বর স্বামী মন্দিরে পুজো দিতে গিয়ে তিনি প্রাচীন রীতি মেনে মাথার চুল দান করেছেন। সেই ছবি ও ভিডিও প্রকাশ্যে আসতেই ফের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে তিরুপতির বহুল প্রচলিত ‘চুল দান’ বা মুন্ডন প্রথা।


প্রশ্ন উঠছে, কেন প্রতি বছর কোটি কোটি মানুষ স্বেচ্ছায় নিজের মাথার চুল কেটে ভগবান ভেঙ্কটেশ্বরের চরণে নিবেদন করেন? শুধুই কি ধর্মীয় বিশ্বাস, নাকি এর পেছনে রয়েছে বহু শতাব্দী পুরনো পৌরাণিক ইতিহাস, দর্শন এবং আত্মসমর্পণের এক গভীর বার্তা?



অন্ধ্রপ্রদেশের তিরুমালা পাহাড়ের ওপর অবস্থিত শ্রী ভেঙ্কটেশ্বর মন্দির শুধু ভারতের নয়, বিশ্বের অন্যতম ধনী ও ব্যস্ততম তীর্থক্ষেত্র। প্রতিদিন হাজার হাজার ভক্ত এখানে দর্শনের জন্য আসেন, আর বিশেষ উৎসব বা ছুটির দিনে সেই সংখ্যা কয়েক লক্ষ ছাড়িয়ে যায়।


এই বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থীর একটি বড় অংশ মন্দিরে প্রবেশের আগে স্বেচ্ছায় মাথার চুল দান করেন। নারী, পুরুষ, শিশু— বয়স বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে অসংখ্য মানুষ এই আচার পালন করেন। সাধারণ ভক্তদের পাশাপাশি বহু শিল্পপতি, অভিনেতা, ক্রীড়াবিদ, রাজনীতিক এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বও অতীতে এই প্রথা অনুসরণ করেছেন। অনন্ত আম্বানির সাম্প্রতিক চুল দান সেই দীর্ঘ ঐতিহ্যকেই আবার নতুন করে জাতীয় আলোচনায় নিয়ে এসেছে।


এই প্রথার উৎস সম্পর্কে বিভিন্ন পুরাণ এবং স্থানীয় ধর্মীয় বিশ্বাসে একটি বহুল প্রচলিত কাহিনির উল্লেখ পাওয়া যায়। কথিত আছে, একসময় ভগবান ভেঙ্কটেশ্বর পৃথিবীতে অবস্থান করার সময় এক গোয়ালার ভুলে তাঁর মাথায় আঘাত লাগে। সেই আঘাতে মাথার একটি অংশের চুল উঠে যায়। এই দৃশ্য দেখে অত্যন্ত ব্যথিত হন ভগবানের একনিষ্ঠ ভক্ত নীলা দেবী।


ভক্তির নিদর্শন হিসেবে তিনি নিজের মাথার চুল কেটে ভগবানের ক্ষতিগ্রস্ত অংশে নিবেদন করেন। তাঁর এই নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগে সন্তুষ্ট হয়ে ভগবান আশীর্বাদ দেন যে, ভবিষ্যতে যাঁরা ভক্তিভরে নিজের চুল তাঁকে উৎসর্গ করবেন, তাঁদের ভক্তি তিনি গ্রহণ করবেন এবং তাঁদের আন্তরিক প্রার্থনা শুনবেন। এই কিংবদন্তিকেই কেন্দ্র করে তিরুমালায় চুল দানের প্রথা ধীরে ধীরে ধর্মীয় আচারে পরিণত হয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়।



ধর্মীয় বিশেষজ্ঞদের মতে, চুল দানের অর্থ কেবল একটি আচার পালন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আত্মসমর্পণ এবং অহং ত্যাগের এক গভীর বার্তা।

মানুষের চুলকে অনেক সময় ব্যক্তিত্ব, সৌন্দর্য, অহংকার এবং আত্মপরিচয়ের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। সেই কারণেই ভগবানের সামনে নিজের সবচেয়ে প্রিয় বাহ্যিক অলংকারটি ত্যাগ করার মধ্যে আত্মিক বিনয় প্রকাশ পায়। অর্থাৎ, ভক্ত যখন মাথা ন্যাড়া করে ভগবানের সামনে দাঁড়ান, তখন তিনি প্রতীকীভাবে জানিয়ে দেন— জাগতিক অহংকার, সামাজিক পরিচয় এবং ব্যক্তিগত গর্বের চেয়ে ঈশ্বরের প্রতি তাঁর বিশ্বাসই সবচেয়ে বড়। এই কারণেই অনেক ধর্মতত্ত্ববিদ চুল দানকে আত্মশুদ্ধি, বিনয় এবং ঈশ্বরের প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।



অনেক ভক্তের কাছে চুল দান মানত পূরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারও পরিবারের সদস্য অসুস্থ হলে, কেউ পরীক্ষায় সফল হওয়ার প্রার্থনা করলে, আবার কেউ জীবনের কঠিন সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় ভগবানের কাছে মানত করেন। সেই ইচ্ছা পূরণ হয়েছে বলে বিশ্বাস করলে পরে তাঁরা তিরুপতিতে গিয়ে মাথার চুল উৎসর্গ করেন।

তবে শুধু মানত পূরণ নয়, অনেকেই জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু করার আগে— যেমন সন্তানের জন্ম, বিবাহ, ব্যবসার সূচনা বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সময়ও এই ধর্মীয় আচার পালন করেন।



তিরুমালা মন্দির কর্তৃপক্ষের অধীনে বিশেষ ‘কল্যাণ কাট্টা’ কমপ্লেক্সে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের চুল কাটা হয়। প্রশিক্ষিত কর্মীরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে এই কাজ সম্পন্ন করেন।

চুল কেটে নেওয়ার পর ভক্তরা স্নান করে মন্দিরে প্রবেশ করেন এবং তারপর ভগবান ভেঙ্কটেশ্বরের দর্শন করেন। অনেকের বিশ্বাস, এই আচার সম্পন্ন করার পরই পূজা সম্পূর্ণ হয়। প্রতিদিন এত বিপুল পরিমাণ চুল সংগ্রহ হওয়ায় তিরুমালা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মানবচুল সংগ্রহকেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত।



অনেকেই মনে করেন, মন্দিরে দান করা চুল ফেলে দেওয়া হয়। বাস্তবে কিন্তু বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সংগ্রহ করা চুল বিশেষভাবে বাছাই, পরিষ্কার এবং প্রক্রিয়াজাত করার পর আন্তর্জাতিক বাজারে নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়। এই চুল মূলত উচ্চমানের উইগ, হেয়ার এক্সটেনশন এবং প্রসাধনী শিল্পে ব্যবহৃত হয়। এই নিলাম থেকে প্রতি বছর মন্দির কর্তৃপক্ষের বিপুল আয় হয়। সেই অর্থ মন্দির পরিচালনা, ভক্তদের বিভিন্ন পরিষেবা, শিক্ষা, হাসপাতাল, অন্নদান এবং সমাজকল্যাণমূলক নানা প্রকল্পে ব্যয় করা হয়। অর্থাৎ, ভক্তদের ধর্মীয় নিবেদন পরোক্ষভাবে সমাজসেবার কাজেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।



অনন্ত আম্বানির মতো দেশের অন্যতম পরিচিত শিল্পপতি পরিবারের সদস্য যখন প্রকাশ্যে এই প্রাচীন আচার পালন করেন, তখন তা স্বাভাবিকভাবেই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাঁর এই পদক্ষেপ অনেকের কাছেই একটি বার্তা— অর্থ, প্রতিপত্তি বা সামাজিক অবস্থান যাই থাকুক না কেন, ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে সকলেই সমান। সোশ্যাল মিডিয়াতেও তাঁর চুল দানের ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর বহু মানুষ তিরুপতির এই ঐতিহ্য সম্পর্কে নতুন করে জানতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।



প্রযুক্তির যুগে মানুষের জীবনযাত্রা যতই আধুনিক হোক না কেন, তিরুপতির চুল দানের মতো ধর্মীয় প্রথাগুলির জনপ্রিয়তা কমেনি। বরং প্রতি বছর নতুন প্রজন্মের ভক্তরাও এই রীতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। কারণ, এই আচার শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি বিশ্বাস, কৃতজ্ঞতা, আত্মসংযম, বিনয় এবং ঈশ্বরের প্রতি সম্পূর্ণ আস্থার এক প্রতীক। আজও লক্ষ লক্ষ মানুষ মনে করেন, জীবনের সাফল্য, সুখ কিংবা কঠিন সময় অতিক্রম করার পেছনে ঈশ্বরের আশীর্বাদ রয়েছে। তাই তাঁরা নিজের অহংকারের প্রতীক চুল উৎসর্গ করে কৃতজ্ঞতা জানান এবং নতুন আশার সঙ্গে জীবনের পথচলা শুরু করেন।


সেই কারণেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তিরুপতির এই প্রথা শুধু টিকে থাকেনি, বরং ভারতের অন্যতম পরিচিত ধর্মীয় ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। আর অনন্ত আম্বানির সাম্প্রতিক চুল দান সেই চিরন্তন বিশ্বাসকেই আবারও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এনে দিয়েছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!