আদালতের চোখে সবাই সমান—এই বার্তাই যেন আরও একবার স্পষ্ট করে দিল কলকাতা হাইকোর্ট। চোখের উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতি চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু সেই মামলার দ্রুত শুনানির আবেদন জানিয়ে আদালতে যে বিশেষ সুবিধা পাওয়া যাবে না, তা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলেন বিচারপতি।
বৃহস্পতিবার কলকাতা হাইকোর্টে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মামলার দ্রুত শুনানির আবেদন ওঠে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের এজলাসে। সাংসদের আইনজীবীরা আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে জানান, চিকিৎসাজনিত কারণেই মামলাটি জরুরি ভিত্তিতে শুনানি প্রয়োজন। তবে সেই আবেদন গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন বিচারপতি।
আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, বিচারপতি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে মামলাটি আদালতের তালিকায় যে ক্রমে নথিভুক্ত হয়েছে, সেই নিয়ম মেনেই তার শুনানি হবে। কোনও ব্যক্তির পরিচয়, রাজনৈতিক পদ বা জনপ্রতিনিধি হওয়ার কারণে আদালতের নির্ধারিত পদ্ধতি বদলানো হবে না। ফলে মামলার জন্য আলাদা করে জরুরি শুনানির সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না।
এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে পরিষ্কার হয়েছে, বিচারপ্রার্থীর পরিচয় নয়, আইনি প্রক্রিয়াই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আদালতের প্রতিটি মামলাই নির্দিষ্ট নিয়ম ও তালিকা অনুযায়ী এগোয়, এবং সেই নীতি থেকে সরে আসতে রাজি নয় হাইকোর্ট।
উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন ধরেই চোখের সমস্যায় ভুগছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। অতীতে একাধিকবার বিদেশে চিকিৎসা করাতে গিয়েছেন তিনি। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী ফের বিদেশে গিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা করানোর প্রয়োজন হয়েছে বলেই জানা গিয়েছে। সেই কারণেই প্রয়োজনীয় অনুমতির জন্য কলকাতা হাইকোর্টে আবেদন করেছিলেন তৃণমূল সাংসদ।
আইনি মহলের একাংশের মতে, বিদেশ যাত্রার ক্ষেত্রে আদালতের অনুমতি প্রয়োজন হলে সাধারণত আবেদনকারীকে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই যেতে হয়। বিশেষ জরুরি পরিস্থিতি না থাকলে আদালত সাধারণ নিয়ম ভেঙে দ্রুত শুনানির অনুমতি খুব কম ক্ষেত্রেই দেয়। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও সেই একই নীতি অনুসরণ করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক মহলেও এই ঘটনাকে ঘিরে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। বিরোধীদের একাংশের দাবি, আদালতের এই অবস্থান দেখিয়ে দিল যে বিচারব্যবস্থা কোনও রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা আচরণ করে না। অন্যদিকে তৃণমূলের একাংশের মতে, চিকিৎসার বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল। যদিও আদালত এই বিষয়ে এখনও মামলার মূল বক্তব্য শোনেনি। শুধুমাত্র দ্রুত শুনানির আবেদন নিয়েই সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।
তবে আদালতের এই নির্দেশে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিদেশযাত্রা সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া কিছুটা সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠতে পারে। কারণ এখন তাঁকে অপেক্ষা করতে হবে মামলাটি তালিকায় নির্ধারিত নম্বরে আসা পর্যন্ত। এরপরই মূল শুনানি হবে এবং আদালত সিদ্ধান্ত নেবে বিদেশে চিকিৎসার জন্য তাঁকে অনুমতি দেওয়া হবে কি না।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা বিচারব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। আদালতের কাছে প্রত্যেক নাগরিক সমান। রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি কিংবা সাধারণ মানুষ—সবার ক্ষেত্রেই আইনি প্রক্রিয়া একইভাবে প্রযোজ্য। আদালতের নির্ধারিত পদ্ধতি মেনে চলাই বিচারব্যবস্থার মূল ভিত্তি।
এখন নজর আগামী শুনানির দিকে। আদালত যখন মামলার মূল বিষয়ে শুনানি করবে, তখন চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা, বিদেশ সফরের কারণ এবং সংশ্লিষ্ট আইনি বিষয়গুলি খতিয়ে দেখা হবে। সেই শুনানির উপরই নির্ভর করবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিদেশে চিকিৎসার পথ কতটা সহজ হবে।
ফলে আপাতত একটাই বার্তা স্পষ্ট—দ্রুত শুনানির আবেদন খারিজ হলেও মামলার দরজা বন্ধ হয়নি। তবে আদালতের নির্ধারিত নিয়ম মেনেই এগোতে হবে পরবর্তী সমস্ত আইনি পদক্ষেপ।

