তারাতলা দুর্ঘটনার পর নড়েচড়ে প্রশাসন, কলকাতার নির্মাণ প্রকল্পে বিশেষ নজরদারি

NEWS INDIA বাংলা
0


Taratala building collapse rescue operation construction audit Kolkata


কলকাতার বুকে নির্মাণাধীন বহুতল ধসে প্রাণহানির ঘটনায় তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তারাতলার এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর রাজ্য প্রশাসন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের ঘোষণা করেছে। প্রাথমিক তদন্তে নির্মাণ সংক্রান্ত গুরুতর ত্রুটির ইঙ্গিত মেলার পর শহরের বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।


দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনওরকম আপস করা হবে না। সেই লক্ষ্যেই রাজ্যের বিভিন্ন দপ্তরের আধিকারিকদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ অডিট টিম গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই টিমে থাকবেন পূর্ত দপ্তর, দমকল, সিভিল ডিফেন্স, পুলিশ প্রশাসন এবং কলকাতা পুরসভার প্রকৌশলীরা।


সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, আগামী কয়েক সপ্তাহ ধরে কলকাতার সমস্ত নির্মাণাধীন বাণিজ্যিক প্রকল্পের নকশা, নির্মাণমান এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা হবে। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলির কাঠামোগত নিরাপত্তা যাচাই না হওয়া পর্যন্ত নতুন করে নির্মাণকাজ শুরু করার অনুমতি দেওয়া হবে না। তবে হাসপাতাল, মেট্রো রেল, দমকল এবং প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলিকে এই পর্যালোচনার বাইরে রাখা হয়েছে।


প্রাথমিক তদন্তে কী উঠে এল?


কলকাতা পুরসভার ইঞ্জিনিয়ারদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে জানা গিয়েছে, ভেঙে পড়া ভবনটির নকশা এবং নির্মাণ পদ্ধতিতে একাধিক অসঙ্গতি থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কাঠামোগত ভারসাম্যের ঘাটতি বা প্রকৌশলগত ত্রুটিই দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হতে পারে। যদিও চূড়ান্ত রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত কোনও নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চাইছে না প্রশাসন।


সূত্রের খবর, ভবনটির নকশা কয়েক মাস আগেই অনুমোদন পেয়েছিল। সেই কারণেই প্রশ্ন উঠছে, অনুমোদনের সময় সমস্ত নিরাপত্তা মানদণ্ড সঠিকভাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না। তদন্তকারী সংস্থা এখন সেই দিকটিও খতিয়ে দেখছে।


উদ্ধারকাজে সেনাবাহিনীর সহায়তা


দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় দমকল, বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী এবং পুলিশ। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে পরে ভারতীয় সেনাবাহিনীরও সহায়তা নেওয়া হয়। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে পড়া শ্রমিকদের খোঁজে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হচ্ছে।


ড্রোন নজরদারি, বিশেষ উদ্ধার সরঞ্জাম এবং প্রশিক্ষিত অনুসন্ধানী কুকুরের সাহায্যে ধ্বংসস্তূপের বিভিন্ন অংশে তল্লাশি চালানো হয়। উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা জানান, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের জীবিত উদ্ধার করাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।


সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দুর্ঘটনায় অন্তত তিনজন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও একাধিক ব্যক্তি। উদ্ধার হওয়া শ্রমিকদের দ্রুত চিকিৎসার জন্য বিশেষ গ্রিন করিডর তৈরি করে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। চিকিৎসকদের একটি বিশেষ দল তাঁদের শারীরিক অবস্থার উপর নজর রাখছেন।


বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান


দুর্ঘটনার পর রাজ্য সরকার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, নির্মাণ সংক্রান্ত কোনও ধরনের অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না। জলাশয় ভরাট করে নির্মাণ, অনুমোদনহীন নকশা বা নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


প্রশাসনের একাংশের মতে, দ্রুত নগরায়ণের চাপে অনেক সময় নিয়মের ব্যত্যয় ঘটে। কিন্তু তার ফল যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তারাতলার ঘটনা আবারও সেই বাস্তবতা সামনে এনে দিয়েছে।


এদিকে দুর্ঘটনার জেরে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। নির্মাণক্ষেত্রে কাজ করা হাজার হাজার শ্রমিক প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন। তাঁদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আরও কঠোর নিয়ম এবং নিয়মিত পরিদর্শনের দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে।


তারাতলার এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা শুধু একটি ভবন ধসের ঘটনা নয়, বরং শহরের নির্মাণ ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এখন সকলের নজর তদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্টের দিকে। কারণ সেই রিপোর্টই জানাবে, এই বিপর্যয়ের নেপথ্যে ছিল নকশাগত ত্রুটি, নির্মাণে গাফিলতি, নাকি অন্য কোনও কারণ।


তবে আপাতত একটাই বার্তা স্পষ্ট—মানুষের প্রাণের নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রশাসন আর কোনও ঝুঁকি নিতে রাজি নয়।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!