আসন্ন ২১ জুলাই শহিদ দিবসের সমাবেশকে ঘিরে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল। বৃহস্পতিবার উত্তর কলকাতা জেলা তৃণমূলের উদ্যোগে আয়োজিত এক প্রস্তুতি সভা থেকে দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে ফোনে বার্তা পাঠান তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই বার্তায় তিনি বলেন, ‘৫ জন কর্মী থাকলেও আমি ধর্মতলায় যাব।’
বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষের উদ্যোগে রামমোহন হলে এই সভার আয়োজন করা হয়। সেখানে উপস্থিত কর্মীদের উদ্দেশে মমতা জানান, শহিদ স্মরণ কর্মসূচি তৃণমূল কংগ্রেস বরাবরই ধর্মতলায় আয়োজন করে এসেছে এবং এবারও প্রশাসনিক অনুমতি মিললে একই জায়গাতেই কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা রয়েছে।
দলীয় সূত্রের খবর, এবারের ২১ জুলাইয়ের সমাবেশকে সংগঠনকে নতুনভাবে চাঙ্গা করার গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে দেখছে তৃণমূল। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কর্মীদের মনোবল ধরে রাখা এবং দলীয় ঐক্যের বার্তা পৌঁছে দিতেই নেত্রী এই কর্মসূচির উপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন।
মমতা তাঁর ফোনবার্তায় কর্মীদের উদ্দেশে আরও বলেন, ‘যাঁদের শুভবুদ্ধি আছে তাঁরা ফিরে আসুন। আমরা টাকার লোভে দল বিক্রি করব না। মানুষের জন্য লড়াই করাই আমাদের কাজ।’ তিনি দলত্যাগীদের উদ্দেশেও পরোক্ষ বার্তা দিয়ে বলেন, রাজনৈতিক লড়াইয়ের সময়ে সংগঠনের পাশে থাকা কর্মীদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সভায় উপস্থিত একাধিক নেতা-কর্মীর মতে, নেত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে তিনি ২১ জুলাইয়ের মঞ্চ থেকে কর্মীদের কাছে নতুন করে লড়াইয়ের বার্তা পৌঁছে দিতে চান। দীর্ঘদিন ধরেই তৃণমূলের কাছে এই দিনটি শুধুমাত্র শহিদ স্মরণ নয়, বরং দলীয় কর্মীদের একত্রিত হওয়ার অন্যতম বড় রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে।
নিজের বক্তব্যে বিজেপিকেও নিশানা করেন মমতা। তাঁর অভিযোগ, বিভিন্ন জায়গায় দলীয় কর্মীদের উপর চাপ তৈরি করা হচ্ছে। সেই পরিস্থিতিতে সংগঠিতভাবে লড়াই চালিয়ে যেতে কর্মীদের একজোট থাকার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের স্বার্থে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য তৃণমূল কংগ্রেসকে আরও শক্তিশালী হতে হবে।
এবারের ২১ জুলাইয়ের সমাবেশকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলেও বাড়ছে আগ্রহ। কারণ, রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলের পর এই প্রথমবার এত বড় আকারে শহিদ দিবস পালন করতে চলেছে তৃণমূল। ফলে সমাবেশে নেত্রীর বক্তব্য এবং দলীয় কর্মীদের উপস্থিতি—দুই দিকেই নজর থাকবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের।
প্রসঙ্গত, ২১ জুলাই তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে একটি আবেগঘন দিন। ১৯৯৩ সালের ঘটনাকে স্মরণ করে প্রতি বছর ধর্মতলায় শহিদ দিবস পালন করে দল। গত কয়েক বছরে এই সমাবেশ রাজ্যের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক জমায়েতে পরিণত হয়েছিল। দূরদূরান্ত থেকে কর্মী-সমর্থকরা বাস, ট্রেন ও অন্যান্য পরিবহণে করে কলকাতায় এসে যোগ দিতেন এই কর্মসূচিতে।
তবে এবারের সমাবেশকে ঘিরে কিছু আইনি ও প্রশাসনিক বিষয়ও সামনে এসেছে। অতীতের একটি মামলার প্রেক্ষিতে হাই কোর্টে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। যদিও তৃণমূলের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, সমস্ত আইন মেনে এবং প্রশাসনিক অনুমতি নিয়েই কর্মসূচি আয়োজন করা হবে।
দলীয় পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, মমতার ‘৫ জন থাকলেও ধর্মতলায় যাব’ মন্তব্যটি আসলে কর্মীদের উদ্দেশে প্রতীকী বার্তা। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, সংখ্যার চেয়ে সংগঠনের প্রতি বিশ্বাস এবং আন্দোলনের ধারাবাহিকতাকেই তিনি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। নেত্রীর এই মন্তব্যের পর থেকেই তৃণমূলের বিভিন্ন জেলা সংগঠনে ২১ জুলাইয়ের প্রস্তুতি আরও জোরদার হয়েছে বলে খবর।
এখন দেখার, আগামী ২১ জুলাই ধর্মতলার মঞ্চে তৃণমূল কেমন সমাবেশ করতে পারে এবং সেই মঞ্চ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কী রাজনৈতিক বার্তা দেন। কারণ, বাংলার রাজনীতিতে ২১ জুলাই বরাবরই একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন, আর এবারের সমাবেশও যে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে, তা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট।

