পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন করে চর্চার কেন্দ্রে উঠে এসেছে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউনিফর্ম সিভিল কোড (UCC)। রাজ্য সরকার বিধানসভায় ইউসিসি সংক্রান্ত একটি বিল পেশ করতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে। নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দিকেই সরকার এগোচ্ছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে।
দীর্ঘদিন ধরেই ইউসিসি নিয়ে জাতীয় স্তরে বিতর্ক ও আলোচনা চলেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য, দেশের সমস্ত নাগরিকের জন্য ব্যক্তিগত আইন সংক্রান্ত ক্ষেত্রে সমান আইনি কাঠামো থাকা উচিত। অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের একাংশের মত, বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত। ফলে এই আইন কার্যকর করার আগে বিস্তৃত আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
রাজনৈতিক সূত্রের খবর, পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠনের সময় যে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলি দেওয়া হয়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করা। সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের লক্ষ্যে বিধানসভায় একটি প্রস্তাব বা বিল আনা হতে পারে বলে আলোচনা চলছে। যদিও বিলের চূড়ান্ত খসড়া বা সরকারের তরফে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
অভিন্ন দেওয়ানি বিধি মূলত বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার, দত্তক গ্রহণ, ভরণপোষণ এবং পারিবারিক সম্পর্ক সংক্রান্ত আইনকে একটি অভিন্ন কাঠামোর আওতায় আনার ধারণা। বর্তমানে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক ব্যক্তিগত আইন বিদ্যমান রয়েছে। ইউসিসি কার্যকর হলে ধর্ম, জাতি বা লিঙ্গ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের জন্য একই ধরনের আইনি বিধান প্রযোজ্য হবে।
সমর্থকদের মতে, এই ব্যবস্থা আইনি সমতা নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে এবং নারী-পুরুষের সমান অধিকারের পথ আরও সুগম করবে। একইসঙ্গে ব্যক্তিগত আইন নিয়ে দীর্ঘদিনের কিছু বৈষম্য দূর হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে সমালোচকদের বক্তব্য, ভারতের বহুত্ববাদী সমাজে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ধর্মীয় রীতিনীতির বিষয়টিও সমানভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
গত কয়েক বছরে দেশের একাধিক রাজ্যে ইউসিসি নিয়ে আলোচনা তীব্র হয়েছে। কিছু রাজ্য ইতিমধ্যেই এই বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়েছে বা খসড়া নীতিমালা প্রকাশ করেছে। সেই প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গেও বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ইউসিসি কেবল একটি আইনি বিষয় নয়; এটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন।
রাজ্যের শাসকদলের নেতারা অতীতে একাধিকবার জানিয়েছেন যে, আইনের চোখে সকল নাগরিকের সমান মর্যাদা নিশ্চিত করাই তাঁদের লক্ষ্য। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলির একাংশ মনে করছে, এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ আইন আনার আগে সর্বদলীয় আলোচনা এবং জনমত সংগ্রহ করা উচিত।
বিধানসভায় বিল পেশ হলে তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শাসক ও বিরোধী উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান তুলে ধরবে বলে মনে করা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্ক আগামী কয়েক সপ্তাহ রাজ্যের রাজনীতির অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
তবে আপাতত সব নজর বিধানসভার দিকে। সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কী প্রস্তাব আনে, বিলের মূল ধারাগুলি কী থাকে এবং তা নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিক্রিয়া কী হয়—সেই দিকেই তাকিয়ে রয়েছে রাজ্যের মানুষ। কারণ অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর হলে তার প্রভাব শুধুমাত্র আইনি ক্ষেত্রেই নয়, সমাজের বিস্তৃত অংশের উপরও পড়তে পারে।
আগামী দিনে এই বিষয়ে আরও স্পষ্ট তথ্য সামনে এলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে এর তাৎপর্য আরও পরিষ্কার হবে। আপাতত ইউসিসি ঘিরে জল্পনা, বিতর্ক এবং রাজনৈতিক উত্তাপ—সব মিলিয়ে রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত মিলছে।

