‘ভারতের চেয়ে পাকিস্তানেই সুখী হিন্দুরা!’ স্বাধীনতা দিবসে জারদারির মন্তব্য ঘিরে তীব্র বিতর্ক
স্বাধীনতা দিবসে হিন্দুদের নিয়ে জারদারির দাবি, পাকিস্তানে সত্যিই কি নিরাপদ সংখ্যালঘুরা?
পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে হিন্দু সম্প্রদায়কে নিয়ে প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারির মন্তব্য ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ১৪ আগস্টের অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়ে জারদারি দাবি করেন, পাকিস্তানে বসবাসকারী হিন্দুরা ভারতে চলে যাওয়ার চেয়ে পাকিস্তানেই থাকতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, পাকিস্তানের হিন্দুরা নিজেদের ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন এবং নিরাপদ। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে ‘অখণ্ড ভারত’ (Akhand Bharat)-এর প্রসঙ্গও।
জারদারির বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত ও পাকিস্তানের মানুষের চিন্তাভাবনায় মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। তিনি বলেন, ভারতীয়রা ‘অখণ্ড ভারত’-এর ধারণায় বিশ্বাসী, অন্যদিকে পাকিস্তান একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হিসেবে নিজস্ব পরিচয় বজায় রেখেছে। তাঁর দাবি, পাকিস্তানের হিন্দু জনগোষ্ঠী স্বাধীনভাবে ধর্মীয় আচার পালন করতে পারেন এবং তাঁদের পছন্দ পাকিস্তানেই থাকা। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি পাকিস্তানের হিন্দু জনসংখ্যার হার প্রায় ৪ শতাংশ বলেও উল্লেখ করেন।
তবে প্রেসিডেন্টের এই দাবির সঙ্গে পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলির প্রতিবেদনের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায়। Human Rights Watch-এর ২০২৬ সালের World Report-এ বলা হয়েছে, পাকিস্তানে ধর্ম অবমাননা সংক্রান্ত আইন (Blasphemy Laws) সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে হয়রানি, নির্বিচারে গ্রেফতার এবং বিচারিক হয়রানির ঝুঁকি তৈরি করছে। অভিযোগের ভিত্তিতে জনতার হাতে হিংসার ঘটনাও ঘটেছে এবং এসব ঘটনায় সরকারের জবাবদিহি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি।
Human Rights Watch-এর আরও একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ পাকিস্তানে ব্যক্তিগত শত্রুতা, চাঁদাবাজি বা জমি দখলের মতো ঘটনায় অপব্যবহারের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। এই ধরনের অভিযোগের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে প্রান্তিক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, অভিযোগের পর বহু মানুষকে নিজেদের বাড়ি ও এলাকা ছেড়ে পালাতেও হয়েছে।
পাকিস্তানে হিন্দুদের জনসংখ্যা নিয়ে অতীতের পরিসংখ্যানও এই বিতর্ককে আরও জটিল করে। Minority Rights Group-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশভাগের আগে বর্তমান পাকিস্তান-অঞ্চলে অমুসলিম জনসংখ্যার অনুপাত ছিল অনেক বেশি। ১৯৪১ সালে West Pakistan-এ অমুসলিমদের অনুপাত প্রায় ২০ শতাংশ ছিল বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশভাগের পর ব্যাপক জনসংখ্যা স্থানান্তরের ফলে এই অনুপাত দ্রুত কমে যায়। একই প্রতিবেদনে পাকিস্তান থেকে হিন্দুদের ভারতে চলে যাওয়ার প্রবণতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে এবং অতীতে বছরে প্রায় ৫ হাজার হিন্দু দেশ ছাড়েন বলে কিছু পাকিস্তানি সূত্রের দাবি তুলে ধরা হয়েছিল। তবে এই ৫ হাজারের পরিসংখ্যানটি বর্তমানের নির্ভুল সরকারি হিসাব হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক হবে না।
ফলে জারদারির বক্তব্যকে ঘিরে মূল প্রশ্নটি দাঁড়াচ্ছে, পাকিস্তানে হিন্দুদের বাস্তব পরিস্থিতি কতটা নিরাপদ ও স্বাধীন। একদিকে রাষ্ট্রপ্রধান সংখ্যালঘুদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার দাবি করছেন, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে আইন ও সামাজিক হিংসার ঝুঁকির কথা উঠে আসছে। এই দুই বিপরীত চিত্রের মধ্যেই জারদারির মন্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

