ভারতের টাকা কোথায় ছাপা হয়? কলকাতার ট্যাঁকশাল থেকে RBI-এর গোপন মুদ্রা ব্যবস্থার অজানা কাহিনি
আপনার হাতে থাকা টাকাটি কোথা থেকে আসে? নোট ছাপা থেকে ছেঁড়া টাকা ধ্বংস—জেনে নিন পুরো প্রক্রিয়া
আমরা প্রতিদিন যে টাকা হাতে নিয়ে বাজার করি, বেতন পাই কিংবা ব্যাঙ্কে জমা রাখি, সেই নোট বা কয়েন আসলে কোথায় তৈরি হয়? কলকাতার ট্যাঁকশালেই কি ছাপা হয় কোটি কোটি টাকা? পুরনো ছেঁড়া নোটই বা শেষ পর্যন্ত কোথায় যায়? ভারতীয় মুদ্রার এই পুরো ব্যবস্থার পিছনে রয়েছে এক বিশাল ও অত্যন্ত সুরক্ষিত Currency Management System।
ভারতে বর্তমানে ব্যাঙ্কনোট ছাপার জন্য রয়েছে মোট চারটি বিশেষ Currency Press। মহারাষ্ট্রের নাসিক এবং মধ্যপ্রদেশের দেওয়াসের প্রেস পরিচালনা করে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন Security Printing and Minting Corporation of India Limited (SPMCIL)। অন্যদিকে কর্ণাটকের মাইসুরু এবং পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনির প্রেস পরিচালনা করে RBI-এর সম্পূর্ণ মালিকানাধীন সংস্থা Bharatiya Reserve Bank Note Mudran Private Limited (BRBNMPL)। অর্থাৎ কলকাতায় যে ট্যাঁকশাল রয়েছে, সেখানে সাধারণ প্রচলিত ব্যাঙ্কনোট ছাপা হয় না।
এবার আসা যাক কয়েন বা ধাতব মুদ্রার কথায়। ভারতের চারটি সরকারি India Government Mint রয়েছে মুম্বই, হায়দরাবাদ, কলকাতা এবং নয়ডায়। কলকাতার ট্যাঁকশালটি রয়েছে আলিপুরে। SPMCIL-এর অধীন এই মিন্টে প্রচলিত কয়েনের পাশাপাশি স্মারক মুদ্রা, মেডেল এবং বিভিন্ন সরকারি সম্মাননার পদকও তৈরি হয়। আলিপুরের এই মিন্টে পূর্ণাঙ্গ কয়েন উৎপাদন শুরু হয় ১৯৫২ সালে।
তবে টাকা তৈরি করলেই সেটি সরাসরি বাজারে চলে আসে না। ব্যাঙ্কনোট ইস্যু করার একমাত্র কর্তৃপক্ষ RBI। দেশের অর্থনীতিতে কত নোট প্রয়োজন, কোন denomination-এর কত চাহিদা রয়েছে এবং পুরনো নোট কতটা বাজার থেকে তুলে নিতে হবে—এসব বিবেচনা করে RBI নোটের প্রয়োজন নির্ধারণ করে এবং সংশ্লিষ্ট প্রেসে চাহিদা পাঠায়। ছাপার পর নোট RBI-এর ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন Currency Chest-এ পৌঁছয়। সেখান থেকে অনুমোদিত ব্যাঙ্কের শাখাগুলির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের হাতে আসে।
কয়েনের ক্ষেত্রেও উৎপাদন ও বাজারে সরবরাহের দায়িত্ব আলাদা। কয়েন তৈরি হয় সরকারি মিন্টে, কিন্তু প্রচলনের জন্য সেগুলি ইস্যু করার দায়িত্ব RBI-এর। অর্থাৎ মুদ্রা ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকার, মিন্ট, নোট প্রেস এবং RBI—প্রত্যেকের আলাদা ভূমিকা রয়েছে।
আর আমাদের হাতে থাকা পুরনো, ময়লা বা ছেঁড়া নোটের কী হয়? RBI-এর Clean Note Policy অনুযায়ী জীর্ণ ও ব্যবহারের অনুপযোগী নোটকে ধীরে ধীরে circulation থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। ব্যাঙ্কের মাধ্যমে জমা হওয়া এমন নোট RBI-এর নির্দিষ্ট ব্যবস্থায় পরীক্ষা ও প্রক্রিয়াকরণের পর ধ্বংস করা হয়। RBI জানিয়েছে, অত্যাধুনিক Currency Verification and Processing System (CVPS)-এর মাধ্যমে নোট যাচাই ও বাছাই করা হয় এবং বাতিল নোট shred করে briquette-এ পরিণত করার ব্যবস্থাও রয়েছে।
অন্যদিকে ছেঁড়া বা mutilated নোটের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়মে ব্যাঙ্কে তা জমা দিয়ে মূল্য ফেরতের সুযোগ রয়েছে। পরীক্ষার পর নিয়ম অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য হলে অর্থ ফেরত দেওয়া হয় এবং সংশ্লিষ্ট নোট পুনরায় বাজারে না গিয়ে ধ্বংসের প্রক্রিয়ায় যায়।
অর্থাৎ, হাতে থাকা একটি নোটের পিছনে রয়েছে নকশা, নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য, মুদ্রণ, পরীক্ষা, সংরক্ষণ, পরিবহণ, RBI-এর ইস্যু ব্যবস্থা এবং শেষ পর্যন্ত পুরনো নোট প্রত্যাহারের একটি দীর্ঘ chain। টাকা শুধু ছাপা হয় না—একটি নির্দিষ্ট জীবনচক্রের মধ্য দিয়ে তা বাজারে আসে এবং শেষ পর্যন্ত circulation থেকে বেরিয়েও যায়।

