রাজনৈতিক পালাবদলের পর বাংলায় আইনশৃঙ্খলা নিয়ে চাপ, ২৪ ঘণ্টায় দুই ঘটনায় বাড়ছে প্রশ্ন
একদিকে প্রাক্তন মন্ত্রীর মৃত্যু, অন্যদিকে বাবা-ছেলে খুন, রাজনৈতিক পালাবদলের পর বাংলায় নতুন চাপ
রাজনৈতিক পালাবদলের পর পশ্চিমবঙ্গে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে বীরভূমে প্রাক্তন মন্ত্রী তথা বিধানসভার প্রাক্তন ডেপুটি স্পিকার আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু এবং নদিয়ার নাকাশিপাড়ায় কংগ্রেস নেতা আনিসুর রহমান ও তাঁর ২৪ বছরের ছেলে আবু সুফিয়ান রহমানের খুন, দুই ঘটনাই রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোড়ন তৈরি করেছে। দুটি ঘটনার চরিত্র ও প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও, বিরোধীদের প্রশ্নের কেন্দ্রে উঠে এসেছে প্রশাসনের ভূমিকা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি।
রবিবার সকালে রামপুরহাটে নিজের বাড়ির লাগোয়া তৃণমূলের দলীয় কার্যালয় থেকে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। পুলিশ দেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে একটি হাতে লেখা চিঠিও উদ্ধার হয়েছে, যাকে প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যার নোট বলে মনে করা হচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলেই মনে হচ্ছে। তবে মৃত্যুর চূড়ান্ত কারণ ময়নাতদন্ত ও তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে।
পাঁচবারের বিধায়ক আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের মন্ত্রী এবং বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রামপুরহাট কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী ধ্রুব সাহার কাছে পরাজিত হন। মৃত্যুর আগে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, দলীয় দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানো এবং নির্বাচনী পরাজয় নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছিল। তাঁর উদ্ধার হওয়া চিঠিতে রাজনৈতিক জীবনে আসা নিয়ে আক্ষেপ এবং নিজের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করার কথা উঠে এসেছে। তবে এই বিষয়গুলির কোনওটিকেই মৃত্যুর সরাসরি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।
অন্যদিকে, নদিয়ার নাকাশিপাড়ায় কংগ্রেস নেতা আনিসুর রহমান ও তাঁর ছেলে আবু সুফিয়ান রহমানকে গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়ে খুনের অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি ঘটে বেথুয়াডহরি এলাকার কাছে। পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে এক তৃণমূল-ঘনিষ্ঠ মহিলা পঞ্চায়েত প্রধানও রয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং রাজনৈতিক যোগসূত্র এখনও তদন্তাধীন।
এই জোড়া ঘটনা এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান হয়েছে এবং বিজেপির নেতৃত্বে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। শুভেন্দু অধিকারী ৯ মে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন এবং তিনি রাজ্যের প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হন। নতুন সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার পুনর্গঠন ছিল।
ফলে ক্ষমতার পালাবদলের পর পরপর এই দুই ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে। আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ইতিমধ্যেই পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন এবং কোনও হুমকির বিষয় ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছেন।
তবে দুই ঘটনাকে একই সূত্রে দেখার মতো কোনও প্রমাণ এখনও সামনে আসেনি। একটি মৃত্যুকে ঘিরে তদন্ত চলছে, অন্যটি স্পষ্টতই হত্যাকাণ্ডের মামলা। ফলে রাজনৈতিক অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের বাইরে তদন্তের অগ্রগতি, ময়নাতদন্ত, ফরেনসিক তথ্য এবং গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ থেকেই প্রকৃত কারণ সামনে আসবে। নতুন সরকারের কাছে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা, এই ঘটনাগুলির তদন্ত কতটা দ্রুত, নিরপেক্ষ এবং স্বচ্ছভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়।

