ট্রাম্পের ইরান নিয়ে কড়া অবস্থান
আলোচনা ব্যর্থ হলে অর্থনৈতিক চাপ থেকে সামরিক পদক্ষেপ, হরমুজ ঘিরে বাড়ছে অনিশ্চয়তা
ইরানকে ঘিরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান ক্রমেই কঠোর হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাতের অবসান এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা চললেও এখনও কোনও চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছনো যায়নি। বরং দুই পক্ষের দাবির পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অন্তর্বর্তী শান্তি সমঝোতা পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
ট্রাম্পের বক্তব্যে একই সঙ্গে আলোচনার দরজা খোলা রাখা এবং চাপ বাড়ানোর বার্তা রয়েছে। তিনি আগে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ইরানের সঙ্গে সমঝোতা না হলে অর্থনৈতিকভাবে দেশটিকে আরও চাপে ফেলা অথবা আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পথ বেছে নিতে পারেন। অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি সামরিক বিকল্পও যে পুরোপুরি বাতিল করা হয়নি, তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্যে সেই ইঙ্গিত রয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক মহলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, কূটনৈতিক আলোচনা ব্যর্থ হলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহণপথ এই জলপথ দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহণ হয়। ফলে প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। ইরান জানিয়েছে, হরমুজ পুনরায় পুরোপুরি খুলে দেওয়ার আগে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারসহ একাধিক শর্ত পূরণ করতে হবে। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন জলপথের নিরাপত্তা ও জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতার উপর জোর দিচ্ছে।
১২ আগস্ট ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের হরমুজ প্রণালীর উপর “total control” রয়েছে। এর পরদিন ইরানের বাসিজ বাহিনীর প্রধান হোসেইন তাইয়েব পাল্টা দাবি করেন, প্রণালী এখনও ইরানের নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার অধীনে রয়েছে। দুই পক্ষের এই বিপরীত দাবি পরিস্থিতির সামরিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
এরই মধ্যে ইরানকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবিও তুলেছেন ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অতীতে ইরানের বিভিন্ন সংঘাত, হামলা ও বিক্ষোভে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের জন্য তেহরানকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এই দাবি আগের আলোচনার শর্তগুলির মধ্যে ছিল না। ফলে কূটনৈতিক সমঝোতার পরিধি আরও জটিল হয়েছে এবং হরমুজ নিয়ে দ্রুত চুক্তির সম্ভাবনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি জ্বালানি বাজারে। ৯ আগস্টের উত্তেজনার মধ্যে Brent crude প্রায় ৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৭.৭২ ডলারে পৌঁছেছিল। তবে ১৩ আগস্ট চাহিদা কমার আশঙ্কা এবং যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের মজুত বৃদ্ধির কারণে দাম কিছুটা কমে Brent প্রায় ৮৭.৩২ ডলারে নেমেছে। অর্থাৎ বাজারে তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা কমলেও হরমুজ ও মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি এখনও বড় ঝুঁকি হয়ে রয়েছে।
ভারতের মতো তেল আমদানিনির্ভর অর্থনীতির ক্ষেত্রেও পরিস্থিতিটি গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় ধরে অপরিশোধিত তেলের দাম বেশি থাকলে পরিবহণ ব্যয়, আমদানি বিল এবং মূল্যস্ফীতির উপর চাপ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজার ও মুদ্রাবাজারেও অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের কড়া অবস্থান এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের বিষয় নয়। হরমুজ প্রণালী, বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের স্থিতিশীলতা একই সূত্রে যুক্ত হয়ে গেছে। আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান না এলে অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি সামরিক উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কাই এখন আন্তর্জাতিক মহলের প্রধান উদ্বেগ। তবে শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক সমঝোতার পথ খোলা রয়েছে এবং আগামী কয়েক দিনের আলোচনাই পরিস্থিতির পরবর্তী দিক নির্ধারণ করতে পারে।

