নোভোরোসিস্কে তেলবাহী জাহাজ ঘিরে কেন ইউক্রেনকে থামাল আমেরিকা?

NEWS INDIA বাংলা
0

 

ইউক্রেন-রাশিয়া: তেলবাহী জাহাজে হামলা বন্ধে মার্কিন হস্তক্ষেপ

জেডি ভ্যান্সের অনুরোধে নোভোরোসিস্কে নির্দিষ্ট ট্যাঙ্কারকে লক্ষ্য না করার সিদ্ধান্ত, বিশ্ব তেলবাজার ও যুদ্ধনীতিতে নতুন সমীকরণ

Ukraine Russia war, Novorossiysk oil tanker and Black Sea conflict


 রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে কৃষ্ণসাগরে তেল পরিবহণকে ঘিরে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের অনুরোধের পর ইউক্রেন নোভোরোসিস্ক বন্দর ব্যবহারকারী নির্দিষ্ট তেলবাহী জাহাজের বিরুদ্ধে ড্রোন হামলা সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে বলে Reuters জানিয়েছে। বিষয়টি সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, কাজাখস্তানের তেল রফতানি এবং মার্কিন কোম্পানিগুলির স্বার্থের সঙ্গেও যুক্ত।

Reuters-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রশাসনের উদ্বেগের মূল কারণ ছিল নোভোরোসিস্ক বন্দরের Caspian Pipeline Consortium (CPC) টার্মিনাল দিয়ে কাজাখস্তানের অপরিশোধিত তেল পরিবহণ। ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি কাজাখস্তানের তেল সরবরাহও ব্যাহত হচ্ছিল। এই পথে যেসব ট্যাঙ্কার কাজাখস্তানের তেল বহন করে, সেগুলির অনেকগুলিই রুশ তেল বহন করে না। ফলে সেগুলিকে লক্ষ্যবস্তু করা হলে যুদ্ধের সরাসরি পক্ষ নয় এমন দেশ ও বাণিজ্যিক সংস্থাও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাইয়ের শেষ দিকে ভ্যান্স ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে আলোচনার সময় এই বিষয়টি তোলেন। এরপর ইউক্রেন নির্দিষ্ট শর্তে CPC-র অবকাঠামো এবং রুশ নয় এমন জাহাজকে লক্ষ্য না করার অবস্থান নেয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে ইউক্রেন নোভোরোসিস্ক বন্দরের বিরুদ্ধে সব ধরনের সামরিক অভিযান বন্ধ করেছে। রাশিয়ার সামরিক বা জ্বালানি অবকাঠামো এবং নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা জাহাজকে লক্ষ্য করে অভিযান চালানোর নীতি বহাল থাকতে পারে।

এই সিদ্ধান্তের পেছনে আন্তর্জাতিক তেলবাজারের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কৃষ্ণসাগরে হামলার কারণে CPC-র তেল লোডিং জুলাইয়ে প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গিয়েছিল বলে Reuters-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কাজাখস্তানের তেল উৎপাদনও জুনের তুলনায় জুলাইয়ে প্রায় ১৪ শতাংশ কমে যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে। কাজাখস্তানের তেল রফতানির ক্ষেত্রে CPC একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট হওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়াতে পারে।

এর প্রভাব মার্কিন ব্যবসায়িক স্বার্থেও পড়ছে। কাজাখস্তানে Chevron ও ExxonMobil-এর মতো বড় মার্কিন সংস্থার বিনিয়োগ রয়েছে। CPC রুটে সমস্যা তৈরি হলে তাদের উৎপাদন ও রফতানি কার্যক্রমও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে ওয়াশিংটনের এই হস্তক্ষেপকে শুধু যুদ্ধবিরতি বা কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখলে বিষয়টির অর্থনৈতিক দিকটি আড়ালে থেকে যাবে।

তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত হয়েছে এমন ধারণা করার কারণ নেই। ১২ আগস্ট নোভোরোসিস্কে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার পর রাশিয়ার একটি বড় শস্য টার্মিনালের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়েছিল বলে Reuters জানিয়েছে। অর্থাৎ ইউক্রেন এখনও রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় বন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে সামরিক চাপের আওতায় রাখছে।

বরং ঘটনাটি দেখাচ্ছে, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত এখন যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও জ্বালানি, বাণিজ্য ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে। ইউক্রেন রাশিয়ার যুদ্ধ অর্থনীতিতে আঘাত করতে চাইছে, আর যুক্তরাষ্ট্র একইসঙ্গে মিত্র ইউক্রেনকে সমর্থন করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহ ও মার্কিন ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা করতে চাইছে।

এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে ওয়াশিংটন ও কিয়েভের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ ইউক্রেনকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর স্বাধীনতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণের মার্কিন স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

সব মিলিয়ে, নোভোরোসিস্কের তেলবাহী জাহাজকে ঘিরে এই ঘটনা যুদ্ধের একটি নতুন বাস্তবতা সামনে এনেছে। রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোতে চাপ তৈরি করা যেমন ইউক্রেনের কৌশল, তেমনই বৈশ্বিক তেল সরবরাহের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম অগ্রাধিকার। এই দুই স্বার্থের সংঘাত আগামী দিনগুলিতে কৃষ্ণসাগরকে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্র করে তুলতে পারে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!