শালবনি জমি মামলায় অভিষেকের PA সুমিত রায়কে CID-এর ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ
টানা জেরার পর ফের তলব, সুপ্রিম কোর্টের রক্ষাকবচের মধ্যেই তদন্তে সহযোগিতার নির্দেশ
কলকাতা: পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনিতে কথিত সরকারি জমি প্রতারণা মামলাকে কেন্দ্র করে তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাক্তন ব্যক্তিগত সহায়ক সুমিত রায়কে ঘিরে CID-এর তদন্ত আরও সক্রিয় হয়েছে। ভবানী ভবনে তাঁকে টানা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে এবং পরপর একাধিক দিন তদন্তকারীদের সামনে হাজির হতে হয়েছে। তদন্তের মূল কেন্দ্রে রয়েছে সরকারি জমি সংক্রান্ত অভিযোগ এবং ওই ঘটনায় সুমিত রায়ের ভূমিকা সম্পর্কে তদন্তকারীদের প্রশ্ন। তবে মামলাটি এখনও তদন্তাধীন এবং সুমিত রায়ের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সুমিত রায়ের ভবানী ভবনে হাজিরা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় তদন্তকারীদের প্রশ্নের মুখোমুখি হন তিনি। একটি প্রতিবেদনে শনিবারের জিজ্ঞাসাবাদ প্রায় ১০ ঘণ্টা চলার কথা বলা হয়েছে। এরপর রবিবারও তাঁকে দ্বিতীয় দিনের জন্য CID দফতরে হাজির হতে দেখা যায়। ফলে তদন্তকারীরা তাঁর কাছ থেকে জমি-সংক্রান্ত লেনদেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং মামলার অন্যান্য নথি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে চাইছেন বলে অনুমান তৈরি হয়েছে।
এই মামলার প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। CID তদন্তভার নেওয়ার আগে শালবনি থানায় সরকারি জমি সংক্রান্ত অভিযোগে মামলা হয়েছিল। তদন্তের সময় সুমিত রায়কে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য খোঁজা হচ্ছিল বলে একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পরবর্তীতে তাঁকে ঘিরে আদালতে আইনি লড়াই শুরু হয়। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক FIR থাকার কথাও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তবে বিভিন্ন মামলার অভিযোগ ও আইনি অবস্থান এক নয়, ফলে প্রতিটি অভিযোগকে আলাদাভাবে বিচারাধীন বিষয় হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
ঘটনাপ্রবাহে বড় মোড় আসে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে। ৬ আগস্ট শীর্ষ আদালত সুমিত রায়ের গ্রেফতারে অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দেয় এবং তদন্তে সহযোগিতা করার নির্দেশ দেয়। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, তাঁকে তদন্তকারীদের সামনে নির্দিষ্ট সময়ে হাজির হতে হবে এবং জিজ্ঞাসাবাদে সহযোগিতা করতে হবে। একই সঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাঁর সঙ্গে আইনজীবী বা অন্য কোনও ব্যক্তির উপস্থিতি নিয়ে আদালত নির্দিষ্ট নির্দেশ দিয়েছে। এই রক্ষাকবচের অর্থ তদন্ত বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়; বরং আদালতের নির্ধারিত শর্ত মেনে তদন্তের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সুমিত রায়ের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়ার ইতিহাসও বেশ জটিল। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক FIR-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে জমি-সংক্রান্ত মামলা ছাড়াও অন্য একটি কথিত চাকরি-প্রতারণা মামলার উল্লেখ রয়েছে। কলকাতা হাইকোর্টে দ্রুত শুনানির আবেদনও করা হয়েছিল, কিন্তু আদালত তাৎক্ষণিক শুনানির আবেদন গ্রহণ করেনি বলে রিপোর্টে জানা যায়। ফলে একদিকে তদন্তকারী সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদ, অন্যদিকে আদালতে আইনি সুরক্ষা পাওয়ার চেষ্টা, দুই দিকেই প্রক্রিয়া এগোচ্ছে।
তদন্তের রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। সুমিত রায় দীর্ঘদিন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ স্বাভাবিকভাবেই রাজ্য রাজনীতিতে আলোড়ন তৈরি করেছে। বিরোধীরা বিষয়টি নিয়ে তৃণমূল নেতৃত্বকে আক্রমণ করছে। অন্যদিকে তৃণমূলের পক্ষ থেকে তদন্তকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রশ্ন তোলার প্রবণতা রয়েছে। তবে তদন্তের এই পর্যায়ে রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে প্রকৃত তথ্য, নথি এবং আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এখানে আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কোনও ব্যক্তিকে তদন্তকারী সংস্থা জিজ্ঞাসাবাদ করছে মানেই তিনি অপরাধী, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো আইনগতভাবে সঠিক নয়। CID-এর জিজ্ঞাসাবাদের উদ্দেশ্য হল অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করা, নথিপত্রের সঙ্গে বক্তব্য মিলিয়ে দেখা এবং তদন্তের সম্ভাব্য সূত্র খুঁজে বের করা। সুমিত রায়ের ক্ষেত্রেও একই আইনি নীতি প্রযোজ্য।
আগামী দিনে CID তাঁর কাছ থেকে কী তথ্য পায় এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত কোন দিকে এগোয়, সেটিই এখন নজরের কেন্দ্রে। একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের অন্তর্বর্তী নির্দেশের মেয়াদ ও পরবর্তী শুনানিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তদন্তকারীদের সংগৃহীত তথ্য যদি আদালতে উপস্থাপনযোগ্য প্রমাণে পরিণত হয়, তাহলে মামলায় পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের পথ আরও স্পষ্ট হতে পারে।
সব মিলিয়ে, শালবনি জমি মামলায় সুমিত রায়কে ঘিরে CID-এর একাধিক দিনের জিজ্ঞাসাবাদ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কিন্তু এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল তদন্তের নিরপেক্ষ অগ্রগতি এবং আদালতের নজরদারি। অভিযোগ, রাজনৈতিক দাবি এবং তদন্তের তথ্যকে আলাদা রেখে আদালতে প্রমাণিত তথ্যের ভিত্তিতেই শেষ পর্যন্ত এই মামলার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।

