‘গানটা একদম ফালতু’—আরডি বর্মনকে বলেছিলেন পরিচালক! সেই ধাক্কাতেই তৈরি হল অমর ‘কুছ না কহো’
যে কথায় ভেঙে পড়েছিলেন পঞ্চমদা, সেই ধাক্কাতেই জন্ম নিল ‘কুছ না কহো’-র অমর সুর
ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে রাহুল দেব বর্মন, অর্থাৎ পঞ্চমদার নাম উচ্চারণ করলেই সামনে আসে একের পর এক কালজয়ী সুর। কিন্তু জীবনের শেষ পর্বে সেই কিংবদন্তি সুরকারকেও পেরোতে হয়েছিল কঠিন সময়। কাজের বাজারে তাঁর জনপ্রিয়তা কমছিল, এমনকি মিউজিক কোম্পানিগুলিও তাঁর সুর নিয়ে আগ্রহ হারাচ্ছিল। ঠিক সেই সময়েই আসে ‘১৯৪২: এ লাভ স্টোরি’ (1942: A Love Story)। আর এই ছবির সঙ্গীতই হয়ে ওঠে তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকার।
ছবিটির পরিচালক বিধু বিনোদ চোপড়া সম্প্রতি সেই সময়ের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে জানিয়েছেন, শুরুতে আরডি বর্মন ‘কুছ না কহো’ গানটির একটি দ্রুত লয়ের (fast-paced) সুর শুনিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সুর পরিচালকের প্রত্যাশা পূরণ করেনি। চোপড়ার কথায়, তিনি এমন সঙ্গীত চাইছিলেন যা ছবির ১৯৪২ সালের আবহের সঙ্গে মানানসই এবং আরও গভীর, শাস্ত্রীয় ও চিরন্তন অনুভূতি তৈরি করবে।
কথা বলতে গিয়ে পরিচালক ছিলেন অত্যন্ত সরাসরি। তিনি আরডি বর্মনের বাবা, কিংবদন্তি সুরকার শচীন দেব বর্মনের প্রসঙ্গ তোলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, তিনি ছবিতে যেন সেই সুরকারের ছায়া ও মানের সঙ্গীত শুনতে চান। এমনকি প্রথম সুরটিকে তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেন। এই মন্তব্যে পঞ্চমদা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন বলেও চোপড়া জানিয়েছেন।
তবে এই প্রত্যাখ্যানই শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। চোপড়া তাঁকে হাল ছেড়ে দিতে বলেননি। বরং কাঙ্ক্ষিত সঙ্গীত তৈরি করার জন্য দীর্ঘ সময় দেওয়ার আশ্বাস দেন। এরপর আরডি বর্মন নতুন করে কাজে মন দেন। কিছুদিন পর হারমোনিয়াম নিয়ে তিনি পরিচালককে নতুন একটি সুর শোনান। সেটিই ছিল ‘কুছ না কহো’-র সেই পরিচিত সূচনা, যা পরে হিন্দি সিনেমার অন্যতম স্মরণীয় রোম্যান্টিক সুরে পরিণত হয়।
চোপড়ার বর্ণনা অনুযায়ী, নতুন সুরের প্রথম নোট শুনেই তিনি বুঝেছিলেন—এটাই সেই সঙ্গীত, যার সন্ধান তিনি করছিলেন। আরডি বর্মন নিজেই এই সুরের প্রথম নোটকে মজা করে ‘বাপ কা মাল’ বলতেন। কারণ এর মধ্যে তাঁর বাবা শচীন দেব বর্মনের সুরের উত্তরাধিকারের একটি ছাপ ছিল।
‘কুছ না কহো’ একা নয়, ‘এক লড়কি কো দেখা তো অ্যায়সা লাগা’, ‘পেয়ার হুয়া চুপকে সে’, ‘রিমঝিম রিমঝিম’-এর মতো গান মিলিয়ে ‘১৯৪২: এ লাভ স্টোরি’-র অ্যালবাম ভারতীয় চলচ্চিত্র সঙ্গীতে বিশেষ জায়গা করে নেয়। ছবিটির সঙ্গীতের জন্য আরডি বর্মন মরণোত্তরভাবে Filmfare-এর Best Music Director পুরস্কারও পান।
তবে এই সাফল্যের সম্পূর্ণ স্বাদ পঞ্চমদা পাননি। তিনি ৪ জানুয়ারি ১৯৯৪ সালে মারা যান, আর ‘১৯৪২: এ লাভ স্টোরি’ মুক্তি পায় ১৫ এপ্রিল ১৯৯৪। অর্থাৎ নিজের শেষ সঙ্গীতের পূর্ণ সাফল্য দেখার আগেই চলে যেতে হয়েছিল তাঁকে।
তাই ‘গানটা ফালতু’—এই কঠিন মন্তব্য আসলে শেষ পর্যন্ত অপমানের গল্প হয়ে থাকেনি। বরং সেটিই হয়ে উঠেছিল এক কিংবদন্তি সুরকারের শেষ বড় সৃজনশীল প্রত্যাবর্তনের অনুঘটক। পঞ্চমদার সুর প্রমাণ করে দিয়েছিল, সময় বদলাতে পারে, বাজার বদলাতে পারে, কিন্তু সত্যিকারের সঙ্গীতের শক্তি কখনও পুরনো হয় না।

