বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল, ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের পর শপথ
বিএনপির প্রবীণ নেতা থেকে রাষ্ট্রপতি, নতুন দায়িত্বে মির্জা ফখরুল—কী বদলাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। বিএনপির প্রবীণ নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছেন। শুক্রবার, ২১ আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় ঢাকার বঙ্গভবনের দরবার হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল তাঁকে রাষ্ট্রপতির শপথবাক্য পাঠ করান। শপথের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি।
এর আগে বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৩৪৩টি বৈধ ভোটের মধ্যে মির্জা ফখরুল ২৫৫ ভোট পান। তাঁর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পান ৮৮ ভোট। মোট ৩৪৯ জন ভোটারের মধ্যে ছয়জন ভোট দেননি। ১৯৯১ সালের পর এই প্রথম বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলো।
রাষ্ট্রপতি পদটি বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থায় মূলত সাংবিধানিক ও আনুষ্ঠানিক দায়িত্বকেন্দ্রিক। তবে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান এবং সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হওয়ায় পদটির সাংবিধানিক গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর নতুন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আলাদা তাৎপর্য তৈরি করেছে।
৭৮ বছর বয়সী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। বিএনপির মহাসচিব হিসেবে তিনি দলটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে তিনি বিরোধী রাজনীতির অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। এবার সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে তিনি দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আসীন হলেন। বাংলাদেশ সরকারের ২০২৬ সালের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই পরিবর্তন বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
শপথ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান, মন্ত্রিসভার সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, কূটনীতিক এবং সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। শপথ অনুষ্ঠানের পর রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন মির্জা ফখরুল।
মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বিএনপির ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের প্রেক্ষাপটে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের পর তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকার পরিচালনা করছেন। ফলে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী—দুই সাংবিধানিক পদেই বিএনপির সঙ্গে দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্ক থাকা ব্যক্তিরা রয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক নিরপেক্ষতা এবং দায়িত্ব পালনের ধরন আগামী দিনে বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণে থাকবে।
বিরোধী পক্ষ থেকেও নতুন রাষ্ট্রপতির কাছে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের প্রত্যাশা জানানো হয়েছে। ফলে মির্জা ফখরুলের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হবে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিচয় এবং রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিরপেক্ষ সাংবিধানিক ভূমিকার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। এই বিষয়টি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ কার্যকারিতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মির্জা ফখরুলের সংসদীয় আসন ঠাকুরগাঁও-১ শূন্য হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সংসদীয় আসনটি শূন্য হয়েছে বলে সংসদ সচিবালয়ের গেজেটে জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, বিএনপির ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন এবং দলের দীর্ঘদিনের শীর্ষ নেতার রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হওয়া—এই তিনটি ঘটনা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরছে। এখন নজর থাকবে মির্জা ফখরুল কীভাবে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেন এবং রাজনৈতিকভাবে পরিবর্তিত বাংলাদেশের নতুন অধ্যায়ে তাঁর ভূমিকা কতটা নিরপেক্ষ ও কার্যকর থাকে।

